সত্যদার দোকান

বয়েস সাড়ে চার, ফ্রকের হাফহাতা থেকে বেরিয়ে ছোট্ট হাত. .মুঠিতে ধরা দুটাকার নোট। পাড়ার ভেতরের বড়ো রাস্তায় সাইকেল বেশি চলে, মাঝে মাঝে স্কুটার। তাও ভালো করে এদিক ওদিক দুবার করে দেখে দেখে রাস্তা পার হয় ফ্রক, সেরকমই নির্দেশ ছিল..ভীষণ বাধ্য 
উল্টোদিকে সত্যদার দোকান। বয়েসে হয়ত সত্যজেঠু হবেন, তবু বাবা মা যা বলে, সত্যদা তাই। দাদা..!! চিনির ঠোঙা শক্ত করে ধরে গুটি গুটি বাড়ি ফেরে মেয়েটা। তার ছোট্ট জীবনের সবচেয়ে বড়ো অ্যাচিভমেন্ট। সত্যদার দোকান থেকে চিনি কিনে আনা..
মধ্যবিত্ত পাড়ার সবচেয়ে চালু দোকান, ওপরে শাটারের মাথায় টিনের ঢাকনায় হলুদের ওপর লাল রঙে কিছু একটা নাম লেখা ছিল। অক্ষরগুলো অকালে ঝরে যাওয়ায়,টিনের ওপরে শুধু আলগা লাল রঙের টুকরো লেগে থাকতো। আর জেগে থাকতো নিচের ট্যাগলাইন, জানিনা, হয়তো ওই রংটা বেশি পোক্ত ছিল বলে - "বিবিধ গ্রোসারি এবং স্টেশনারি দ্রব্য পাওয়া যায়"। 
দোকানের নাম কেউ জানতোনা আর তার প্রয়োজনও ছিলোনা। সেযুগে সব দোকানের নামই 'লাল্টুর', 'হরিপদর' 'সত্যদার' হতো। রিক্সায়ালারাও ওই নামেই ভাড়া নিতেন। অতিথিরা সত্যদার দোকানের উল্টোদিকের বা পাশের বা পেছনের গলিতে বাড়ি চিনে ঠিক পৌঁছে যেতেন। 
সত্যদার দোকান চিনতেন না এমন কেউ ওই পাড়ায় বা রাস্তায় ছিলেন না।

সত্যদা নাকি এক পয়সাও কম নিতেন না। সব জিনিস ওনার দোকান থেকে কেনা হয়, সেই একনিষ্ঠতার পুরস্কার হিসেবেও না। অনেক বলার পরে একবার একটা প্লাস্টিকের চিরুনি গিফট করেছিলেন। নব্বইয়ের দশকে আমাদের পাড়ার ছোট গন্ডিতে লয়ালটি পয়েন্টের কনসেপ্ট ছিলোনা আসলে।
সাত বছর বয়েসে ওই পাড়ার পাট চুকিয়ে চলে আসি সপরিবার। সত্যদার দোকান হারিয়ে যায় স্মৃতির অতলে।
তারপর স্কুল, কলেজ, চাকরি জীবন ঘাঁটাঘাঁটি করে যখন ফিরে তাকানোর বয়েসে এসে পড়লাম, হঠাৎ একদিন জীবনের প্রথম অ্যাডভেঞ্চার মনে পড়ে গেলো। 
সাড়ে চারের নস্টালজিয়ার নেশায় পুরোনো পাড়ায় ঘুরতে গেলাম, সাড়ে চব্বিশ। দোকানটা অবশ্য খুঁজে পাইনি। খোঁজখবর করে জানতে পারি, সত্যদা দোকান আপগ্রেড করেছেন। এখন ভার্সন ম্যানেজার ওনার ছেলে। আগের দোকানের পাশেই, পুরোনো দোকানটার তিনগুণ বড়ো, থরে থরে জিনিসপত্র সাজানো, সগর্বে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেই দোকান। 
আগের দোকানটা, স্মৃতি হাতড়ে মনে করি, বেশ অন্ধকার মতো ছিল। একটা টিউবলাইটের আলোয় সত্যদা ভেতরে ঢুকে জিনিসপত্র খুঁজে আনতেন। দুপাশের তাক ভর্তি জিনিসে সরু জায়গাটা আরো সরু হয়ে গিয়ে সুড়ঙ্গের মতো দেখাতো। 
এই দোকানটা ছড়ানো, সিএফএলের আলোয় ঝকঝক করছে। 
আগের দোকানে সত্যদা একটা ছোট্ট ট্রানজিস্টর নিয়ে লুঙ্গি পরে হাতপাখা নিয়ে বসে থাকতেন, চেনা লোক দেখতে পেলে ডেকে খেজুর করতেন। 'আপনাগো বাসায় কাইল দুপুরে কে যেন আসছিলেন। আমি বাড়ি বলে দিলাম। বৌমার বাড়ির লোক?'.. 
এই দোকানের দুটো অল্প বয়স্ক কর্মচারী খদ্দের সামলাতে হিমশিম। 
ছোট ছোট বাড়ি গুলো বড়ো বড়ো মাল্টিস্টোরিড হয়ে যাওয়ায়, এই পাড়ায় এখন লোক আর গাড়ি, দুটোর সংখ্যাই বেড়ে গেছে। আর কোনো সাড়ে চার এখন এই রাস্তা পেরোতে পারবে বলে মনে হয়না।
নস্টালজিয়ার নেশা মিটলো না দেখে ম্রিয়মাণ হয়ে চলে আসছি, এমন সময় দোকানের মাথায় চোখ পড়লো।
সেই পুরোনো ট্যাগলাইন 'গ্রোসারি ও স্টেশনারি দ্রব্য' ইত্যাদি ইত্যাদি.. হলুদ এর ওপর নীল দিয়ে লেখা, একদিকে বাংলা আর আরেকদিকে ইংরেজিতে।
আর তার ওপরে.. ঝলমলে লাল রঙে, দোকানের নাম... 
কুড়ি বছর পরে প্রথম জানতে পারলাম ..
"সত্যব্রত রকমারি ভান্ডার"..!!

Comments

  1. Aare.......Tui likhte shuru korechhis!!!!!!!.....

    Darun....Darun..........Jhor jhore lekha....
    Feel proud for you my dear....

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

সমান্তরাল

কনকাম্বরম

জন্মসূত্রে পাওয়া