কনকাম্বরম

কদিন আগে দুই বন্ধু হাম্পির কথা মনে করালো। বছর দশেক আগে সৌম্যর জন্য একটা ফরমায়েশি গল্প লিখেছিলাম। গল্পটা মনে থাকলেও, লেখাটা খুঁজে পাচ্ছিলামনা। অগত্যা আবার লিখতে হলো। অনেকদিন কিছু পোস্ট করা হয়না। তাই গল্পটায় অতি চেনা ছক, অতিবর্ণন, এইসব সমস্যা থাকা সত্ত্বেও, ছেপেই দিলাম।

***


ছোট ছোট ঢেউয়ের তালে দুপুরের সূর্য কুচি কুচি হয়ে জ্বলছে। একটানা তাকিয়ে থাকা যায়না, ঝিলমিল লেগে যায়। কালো গ্রানাইটের থামে হেলান দিয়ে বসে আছে সৌম্য। থামের ঠান্ডা পাথর থেকে আরাম ছড়িয়ে পড়ছে ওর পিঠে। বাইরের রোদের এলোমেলো গরম হাওয়া বোধহয় জলের ওপর দিয়ে বয়ে আসতে আসতে ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। ঘাম শুকিয়ে যাচ্ছে, শরীর জুড়িয়ে যাচ্ছে, মন শান্ত হয়ে যাচ্ছে।


পুরন্দরদাসের মন্টপের চারপাশে স্থবির দুপুরটা আরামে ঝিমোচ্ছে। বিটঠল মন্দিরের পেছনে ঘুরতে ঘুরতে কাল এই জায়গাটা খুঁজে পেয়েছে সৌম্য। রাস্তার সামনে এ এস আই এর নীল বোর্ড পেরিয়ে চৌকো পাথরের চাতাল, তার পেছনে একটা হলঘর, অনেকটা নাটমঞ্চের মতো। পেছনে তিরতির করে বয়ে চলেছে তুঙ্গভদ্রা। তারই ধারে দালানের একটা থামে হেলান দিয়ে আজ জিরোচ্ছিলো ও। 

হাম্পি এসে থেকে সৌম্যর মনটা রোমান্সে ছেয়ে গেছে। শরদিন্দুর তুঙ্গভদ্রার তীরে পড়াই ছিল.. কাল সারাদিন পাহাড়ের আনাচে কানাচে, মন্দিরের পাথুরে প্রাঙ্গনে, ভাঙা ধ্বংসাবশেষের অলিগলির মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে সত্যি সত্যি যেন চোখের সামনে সব ছবিগুলো জ্যান্ত হয়ে উঠতে দেখতে পাচ্ছিলো। চত্বরের মাঝখানে, এইখানে বোধহয় লোকজন জটলা পাকিয়ে গল্প গুজব করতো। ওই ছোট ছোট ঘরগুলোতে দোকান বসতো, আলোয় নিশ্চয়ই ঝলমল করতো সব। রঙে ভরে থাকতো, শব্দে গন্ধে মেতে থাকতো। কেমন ছিল দিনগুলো? 

আন-ইন্সপায়ারিং কর্পোরেট জীবনের একঘেঁয়েমিতে দিনের পর দিন কাটিয়ে মাথা মগজ সবকিছু যেন ভোঁতা হয়ে গেছে। এই সপ্তাহটা একটু বেশিই চাপের মধ্যে কেটেছে, রোজ বারো চোদ্দ ঘন্টার কাজ, মিটিং, রাতজাগার পর দুদিন আগে সব শেষ হয়েছে। তাই একদিন ছুটি নিয়ে একাই পালিয়ে এসেছে উইকেন্ড কাটাতে, শুনতে ক্লিশে হলেও, ওই যান্ত্রিকতার আওতার বাইরে।

কাল বিকেলে মাল্যবন্ত মন্দিরের পেছনের চাতাল থেকে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিলো, কি সুন্দর জায়গা, এই পাথর, প্রান্তর, ক্ষেত, নদীর জল..

নিশ্চয়ই যখন এসব জায়গা লোকজন ভরা ছিল, তখন এই পথ ঘাট, বাড়ি ঘর আরো সুন্দর লাগতো। জমজমাট, প্রাণবন্ত, সরগরম। যদি ওই সময়ে ফেরত যাওয়া যেত, কেমন হতো?

যদি এই আধুনিক সভ্যতা, এই গাড়ি, বাড়ি, সেল ফোনের টাওয়ার, সব মুছে যেত, খুব খারাপ হতো কি? শান্ত, নিশ্চিন্ত, সহজ আর নিরবচ্ছিন্ন জীবন।


স্রোত বেশি নেই, তবু জলের ওপর হালকা দুলুনি রয়েছে। কোনো রাজা কোনো সময় এদিকের সাথে ওদিকের যাতায়াত সহজ করতে চেয়েছিলেন, অদূরে একটা ভাঙা সেতুর অর্ধেকটা দেহ দাঁড়িয়ে আছে, অবান্তর। এদিকটায় জল কম, জায়গায় জায়গায় পাথরের স্তুপ জেগে আছে। জলের মধ্যে থেকে উঠে থাকা লম্বা লম্বা ঘাস দুলছে, কিছুটা স্রোতের, কিছুটা হাওয়ার তোড়ে। কয়েকটা ফড়িং ঘাসের ডগায় আটকে রয়েছে, এক দুটো ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ করে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। আকাশের গায়ে ঋষ্যমুখ পাহাড় জেগে রয়েছে দিগন্ত ঢেকে। 

অলস দুপুরের দিকে একটানা তাকিয়ে থাকতে থাকতে আরামে শান্তিতে চোখ বুজে আসছিলো সৌম্যর। শরীর মন তন্দ্রায় ডুবে যাচ্ছিলো। ঠিক এইরকম একটা শান্ত অলস সময় কি অসম্ভব চাইছিলো ও কত দিন ধরে..


ঘুমটা যখন ভাঙলো, রোদ পড়ে এসেছে। চোখ খুলতেই প্রথম আকাশের গায়ে সোনালী রংটা চোখে পড়লো। আর কানে এলো পেছনে কার যেন পায়ের শব্দ, মেয়ে মনে হয়, গয়নার টুংটাং আওয়াজও আসছে। পেছন ফিরে একটু অবাকই হলো ও.. চাতালের চারপাশে অনেক ফুলমালা ছড়িয়ে রয়েছে। কেউ মনে হয় এজায়গাটা সাজাবে বলে এসব এনে রেখেছে। এদের কি আজ এখানে কোনো অনুষ্ঠান আছে? এখানে ধ্বংসাবশেষের মাঝখানে মাঝে মাঝে অনুষ্ঠান আয়োজন হয় বটে..

একটা থামের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসেছে একটা মেয়ে। স্থানীয়, জামাকাপড় থেকে বোঝা যায়, মুখটাও এখানের লোকজনের মতোই, তবে আলাদা করে চোখ টানে, বেশ সুন্দরী। হাতে একটা থালার ওপর ঘটি, ফুল আর কিসব যেন, বোধহয় পুজোর থালা। সৌম্যর চোখ খোলা দেখেই বলে ওঠে, আপনার ঘুম ভাঙিয়ে দিলাম বুঝি? 

সৌম্য তড়িঘড়ি বলে ওঠে, না না, তুমি তো কিছু করোনি। কথাটা বলতে বলতে উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছিলো, কিন্তু.. মাথাটা কেমন যেন ঘুরে গেলো.. শরীরটা প্রচন্ড ভয়ে ঘেমে উঠেছে। কান মাথা ঝাঁ ঝাঁ করছে।

এটা কি ভাষায় কথা বললো ও? মেয়েটার কথা স্পষ্ট বুঝতে পারলো ও.. কি করে? ও তো কান্নাড়া বোঝেনা, বলতে পারেনা। উঠে দাঁড়ানোর সময় মেঝের দিকে চোখ পড়েছিল .. ওর পায়ে এটা কি? ওর পরনেই বা এটা কি? পায়ে কিটো স্যান্ডালের বদলে চামড়ার চটির মতো কি যেন একটা। জগার্সটা কোথায় গেলো? এটাতো ধুতি। 

মাথা ঘুরে পড়েই যাচ্ছিলো সৌম্য, নেহাত থামটা ধরে ফেলে নিজেকে আটকেছে। মেয়েটি দেখে দৌড়ে আসে। আপনি ঠিক আছেন? আপনার শরীর ঠিক আছে? কি হয়েছে? সৌম্য বড়ো বড়ো শ্বাস নেয়.. কি হচ্ছে এটা ? কিচ্ছু মাথায় ঢুকছেনা। 

মেয়েটি থালা থেকে ঘটিটা এগিয়ে দেয়, এটা মুখে দিন.. বিটঠলের চরণামৃত। সৌম্য ওর দিকে তাকায়, কিচ্ছু বুঝতে পারছেনা, কিন্তু মেয়েটার উদ্বেগ টুকু পরিষ্কার। সে সত্যি সত্যি চিন্তায় পড়েছে তাকে পড়ে যেতে দেখে।

খানিকটা যেন প্রতিবর্তের জেরেই বলে ওঠে, তুমি চিন্তা করোনা, আমি ঠিক আছি। 

এটা খান, মেয়েটা ঘটিটা আবার এগিয়ে দিয়েছে।

সৌম্য ঘটি নিয়ে আলগোছে মুখে ঢালে। ঘি কর্পূর গন্ধী জল, বোধহয় তুলসীপাতা দেওয়া। গলা ভেজে, একটু যেন ধাতস্থ লাগে।

মেয়েটা ঘটি ফেরত নিয়ে এবার একটা সাদা নাড়ুর মতো জিনিস ওর হাতে দেয়, এই নিন, বিটঠলের প্রসাদ, ভালো লাগবে আপনার। তর্ক করার মতো মনের জোর নেই, সৌম্য বিনা বাক্যব্যয়ে কামড় দেয়.. স্থানীয় কোনো মিষ্টি।

মেয়েটা বসে পড়েছে ওর সামনে, উদ্বিগ্ন মুখে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। 

মিষ্টিটা খেতে খেতে একটু সময় নেয় ও.. ব্যাপারটা একটু ভেবে নেওয়ার চেষ্টা করে। ভাবা কি আদৌ সম্ভব? যদি সম্ভব, যেটুকু সম্ভব।

 

সময়টা মনে হচ্ছে পিছিয়ে গেছে, কিভাবে গেছে? কিভাবে সম্ভব? 

নিজের দিকে চোখ ফেরায়, ওর খালি গা, একটা উত্তরীয়র মতো কাপড় গায়ে জড়ানো। গলায় মুক্তোর মালা। মাথায় হাত দিয়ে দেখে, চুলগুলো লম্বা হয়ে ঘাড় অবধি ঝুলছে, আর কি যেন একটা কাপড় বাঁধা রয়েছে মাথায়, পাগড়ি ধরণের কিছু বোধহয়। কোমরে ভারী মতো একটা ছোট্ট পুঁটলি ঝুলছে। তুলতে যেতে ঝনঝন শব্দ হলো, কয়েন মতো কিছু রয়েছে কি? ব্যাপারটা কি? শুধু মনটুকু আধুনিক সময় থেকে অতি পুরোনো একটা সময়ের, পুরোনো একটা মানুষের দেহে চলে এসেছে?

নিশ্চয়ই এটা স্বপ্ন। 

ও কি ঘুমোচ্ছে? 

কিন্তু সব এতো স্পষ্ট কিকরে? কোথায় যেন পড়েছিল স্বপ্নে সচরাচর রং দেখা যায়না। মেয়েটার দিকে তাকালো, মেয়েটার ঘাগরার রং উজ্জ্বল গোলাপি, চুলের ফুলগুলো সাদা আর কমলা, কপালে সাদা চন্দনের দাগের মাঝে লালচে খয়েরের মতো রঙের একটা ফোঁটা, গয়না গুলো সোনার। স্বপ্ন হলে কি ও দেখতে পেত এসব? তাছাড়া এতো জীবন্ত অনুভূতি, শুধু রং কেন, কান, নাক, হাত পা জিভ সব কিছু তো এত পরিষ্কার কাজ করছে। এই তো জল খেতে গিয়ে কর্পূরের গন্ধ পেলো, আর এখনো, হালকা একটা বেল ফুলের গন্ধ, বোধয় মেয়েটার চুলের মালাটা থেকে ওর নাকে এসে ঢুকছে। 

এবার কি নিজেকে চিমটি কেটে দেখতে হবে?


কোন সাল এটা? 

মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করবে? 

পরে করবে নাহয়। 

মেয়েটার দিকে তাকিয়ে এবার হাসলো ও.. বললো এবার ঠিক লাগছে।

মেয়েটার চোখ থেকেও উদ্বেগ সরে গিয়ে নিশ্চিন্তি দেখা গেলো।

মেয়েটা রিনরিনে স্বরে কথা বলে উঠলো। যাক, আপনাকে দেখে এবার একটু ভালো লাগছে। মন্দির থেকে ফেরার সময় আমি রোজই একবার এই মন্টপে ঘুরে যাই.. অন্যদিন কেউই থাকেনা। কিন্তু আজ আপনি ছিলেন, ঘুমোচ্ছিলেন। চলেই যাচ্ছিলাম, তখনি আপনি জেগে উঠলেন, আর..

উঠে পড়েছে মেয়েটা। আমি চলি, আপনি নিজের খেয়াল রাখবেন।

সৌম্যও উঠে পড়লো, ভাবনার কিছু নেই, আমি ঠিকই আছি.. মনে হয় ক্লান্তিতে, তৃষ্ণায় একটু মাথাটা ঘুরে গেছিলো।

মেয়েটা বলে, বেশ! তাও বলি, আপনি নিজেকে যত্ন করবেন। আজ আমি আসি.. 

নমস্কার জানিয়ে পা বাড়ায় মেয়েটা। 

সৌম্য বলে ওঠে, চলে যাচ্ছ? আমি কি তোমায় এগিয়ে দিতে পারি? আসলে আমিও উঠবো উঠবো ভাবছিলাম।

মেয়েটা হাসে, ঝকঝকে হাসি, তাতে সুন্দর মুখটা আরো মিষ্টি হয়ে গেছে।

আসুন।


সৌম্য হাঁফ ছেড়ে বাঁচে, এগিয়ে এসে মেয়েটার সঙ্গ নেয়.. একা একা থাকতে একদম মন সায় দিচ্ছিলনা তার.. এতরকম চিন্তা তার মাথায় গজগজ করছে, একা থাকলে সেসব আরো চেপে ধরবে। এই মুহূর্তে সেসব নিয়ে জড়িয়ে পড়তে একদম ইচ্ছে করছেনা।

দুজনে হাঁটতে থাকে। মেয়েটা কথা শুরু করে,

আপনি সঙ্গে আসতে চাইলেন, তাতে আমি খুশিই হয়েছি। জানেন, আপনাকে একা রেখে যেতে আমার ঠিক ভালো লাগছিলোনা। 

আপনি বলছেন বটে আপনি ভালো আছেন, তবু একটু অস্বস্তি হচ্ছিলো। 

সৌম্য প্রশ্ন করে, তাই নাকি? কেন? 

ও বলে চলে, জানিনা কেন আপনার ঘুমন্ত মুখটা দেখে কেমন যেন মনে হচ্ছিলো, আপনি খুব আরামে ঘুমোচ্ছেন। কিন্তু ওঠার পর আপনার মুখ চোখ দেখে খুব অদ্ভুত লাগছিলো। 

একটু থেমে আবার বলে,

আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে, আপনি এখানকার লোক নন.. তাই না?

সৌম্য এতক্ষণ পরে একটু মন খুলে হাসলো। তোমার দৃষ্টি দেখছি খুবই প্রখর। ঠিকই ধরেছো, আমি এখানে ঘুরতে এসেছি। আমি থাকি আরেকটু দক্ষিণে।

এখানে কোথায় উঠেছেন? সৌম্য জানায় বিরূপাক্ষ মন্দিরের কাছে এক সরাইতে থাকছে সে.. মেয়েটা আর কিছু জানতে চাইলে মুশকিল।

মেটে রাস্তা শেষ হয়ে এখন পাথর বেছানো রাস্তা ওদের পায়ের নিচে। মন্দির চত্বর শেষ হয়ে লোকালয় শুরু হয়েছে। একদুটো করে ছোট ছোট বাড়ি দেখা যাচ্ছে।

সামনে একটা ছোটোখাটো চৌমাথা।

মেয়েটি বলে, আমার বাড়ি একটু এগিয়ে, ওই দিকে একটা গলিতে.. হাত লম্বা করে সামনের দিকে আঙুল দেখায় সে..

সৌম্য জানতে চায়, আচ্ছা, জানা হয়নি, তোমার নামটা কি?

মল্লী, মেয়েটির স্বর একটু যেন লাজুক। তারপর একটু সাহস করে সৌম্যর দিকে তাকিয়ে বলে.. আপনার নাম?

সৌম্য নাম বলতে মেয়েটি বলে ওঠে, বাঃ.. এই নাম তো আগে শুনেছি বলে মনে হয়না। বেশ সুন্দর আপনার নাম। বলেই যেন আবার একটু লজ্জা পেয়ে যায় মেয়েটি। আর সেটা ঢাকতেই যেন তড়িঘড়ি বলে ওঠে, আপনি কি এখানে আরও কদিন থাকবেন? 

সৌম্য একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মাথা নাড়ে, এখনো জানিনা। 


এতক্ষণ রাস্তায় এক দুজন করে লোক দেখা যাচ্ছিলো, চৌমাথার সামনে আসতেই অনেক লোকজন..কেউ যাতায়াত করছে, অনেকে একসাথে দাঁড়িয়ে গল্প করছে। ওদের দুজনকে দেখে কয়েকজন ওদের দিকেও ভালো করে তাকালো। সুখী সুখী চেহারা, পরিচ্ছন্ন, সুন্দর বেশভূষা সবার।

বাঁ দিকের রাস্তা ধরে এগোলে বোধয় বাজার, ঐদিকে ভিড় বেশি। কয়েকটা ঘোড়াও দেখা গেলো মনে হয়.. বেশ জমজমাট জায়গা।


চৌমাথা ছাড়িয়ে সোজা এগিয়ে এসেছে দুজনে। 

ডানদিকের একটা ছোট্ট গলির মুখে দাঁড়িয়ে মল্লী বললো, এবার আমি আসি, আমার বাড়ি এই গলিতে। 

ছোট্ট সরু গলি, মধ্যবিত্ত ঘরবাড়ি, গলির শেষে পড়ন্ত আলোয় ঝক্ঝকে তুঙ্গভদ্রার জল দেখা যাচ্ছে। সূর্য একটু আগেই মিহি মেঘের পেছনে ডুবে গেছে, সেই মেঘের পেছন থেকে বিকেলটা কনে দেখা আলোয় ভরে গেছে।

সেই মায়াবী আলোয় মল্লীর দিকে তাকিয়ে সৌম্য বললো আবার দেখা হবে তো? মল্লী লজ্জিত চোখদুটো নামিয়ে বলল, আমি তো রোজই বিকেলে বিটঠল মন্দিরে যাই.. এটুকু বলে ঘুরে চলে যাচ্ছিলো, হঠাৎই কি মনে করে যেন মল্লী ফিরে এলো। থালা থেকে এক মুঠো ফুল তুলে নিয়েছে সে। সৌম্যকে বলে, সৌম্য ভদ্র, এগুলো আপনার কাছে রাখুন, পুজোর ফুল.. 

একটু ইতস্তত করে বলে, আপনি জানেন এই ফুলের নাম কি? 

সৌম্য এসব ব্যাপারে অত্যন্ত অজ্ঞ। সাদা ফুলটা বেলফুল বলেই মনে হচ্ছে, কিন্তু কমলা ফুলটা? এখানে সবার চুলে এই ফুলটা দেখেছে বটে..ভারী মিষ্টি দেখতে।

মল্লী বলে, এই কমলা ফুলটার নাম কনকাম্বরম আর সাদাটা.. 

সৌম্য ততক্ষণে কি করবে বুঝতে না পেরে ধুতির কোঁচার একটা দিক খুলে ধরেছে। সেখানে ফুল গুলো রাখে মল্লী। 

সৌম্য ওর কথার রেশ ধরে জিগ্যেস করে.. আর সাদাটা?

রিনরিনে স্বরে উত্তর আসে, মল্লী। 

বলেই মেয়েটা দ্রুত হাঁটা লাগিয়েছে, প্রায় পালিয়েছে।

সৌম্য খানিকক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে সেই মায়াবী আলোয় ওকে চলে যেতে দেখে।  গলির প্রান্তের দিকে একটা বাড়ির সামনে পৌঁছে মেয়েটা একবার ফিরে তাকায়, আর তারপর বাড়িটার মধ্যে অদৃশ্য হয়।

ফুল শুদ্ধ কোঁচা কোমরে গুঁজে সৌম্য চৌমাথার দিকে হাঁটা দেয়।

এই অপার্থিব গোলাপি আলোয় স্নান করে চারদিক যেন রূপকথার মত সুন্দর লাগছে। নদীর দিকটায় আকাশের গায়ে ফিরতি পাখির ঝাঁক। বাজারের দিকটা থেকে কি যেন একটা তাকডুম তাকডুম আওয়াজ এগিয়ে আসছে। লোকজন মোটের ওপর সুখী। এই জীবনের কথাই তো ভাবছিলো সে কাল থেকে। আর মেয়েটা এত মিষ্টি.. মুখে একটা খুশির হাসি ফুটে ওঠে ওর।


চৌমাথার কাছটায় এসে একটু দাঁড়ায় সৌম্য। দুটো ঘোড়ায় দুটো লোক এসে দাঁড়িয়েছে। তারই মধ্যে একজন একটা তবলার মতো যন্ত্র বাজাচ্ছে, এই তাকডুম আওয়াজটাই এতক্ষণ শোনা যাচ্ছিলো। এরা বোধহয় সেপাই ধরণের কিছু, গায়ে চামড়ার বর্ম গোছের একটা জামা, আর কোমরের একপাশ থেকে তলোয়ারের খাপ ঝুলছে।

তাকডুম শেষ হলো, আশপাশে ভিড় জমে গেছে। সৌম্য ভিড়ে যোগ দেয়নি, পেছনে দাঁড়িয়ে শুনছিলো। 

বাজনাওয়ালার সঙ্গী একটা চোঙার মতো যন্ত্র বের করে ঘোষণা শুরু করে, এতদ্বারা সবাইকে রাজাদেশ জানানো হইতেছে, রাজ্যের উত্তর সীমান্তে বাহমনী আক্রমণের আশঙ্কা দেখা দিয়াছে। মহারাজাধিরাজ বীরবিজয়রায়ের ছত্রছায়ায় পরম পরাক্রান্ত যুবরাজ দেবরায় সীমান্ত রক্ষায় সদাতৎপর রহিয়াছেন। আগামী দুই বা তিন মাসের মধ্যে, প্রয়োজনার্থে, রাজ্যের সকল বয়স্থ পুরুষদিগকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকিবার আদেশ জানানো হইতেছে। সকল যুবাপুরুষকে যুদ্ধের অনুশীলনের জন্য নিযুক্তিকরণের কার্য আগামী কল্য হইতে শুরু হইবে।

সকলের সুবিধার জন্য আবার বলছি শুনুন, এতদ্বারা সবাইকে...

সৌম্য পেছন ফিরে উর্দ্ধশ্বাসে দৌড়োতে শুরু করেছে। ওই ঘোষণা আরেকবার শোনার দরকার নেই তার। 

যুদ্ধ? তাকে যুদ্ধ করতে হবে?

শান্ত সহজ জীবন? সুখী নিরুদ্বেগ জীবন? এই জীবন যাপনের স্বপ্ন দেখছিলো সে? যুদ্ধ?

সৌম্য জানেনা ও কি করবে। স্বপ্ন কোথায়.. এতো ক্রমশ দুঃস্বপ্নে পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। কিভাবে পালাবে? কোথায় পালাবে? সৌম্য কিচ্ছু জানেনা, মাথার মধ্যে আবারও সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে? এ কিসব দুঃসহ অভিশাপের মতো ঘটনা ঘটছে তার সাথে? 

গোলাপি আলো নিভে গেছে, সন্ধ্যে নেমে আসছে, অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে।

সৌম্য শুধু দৌড়োতে থাকে।.. দৌড়ে দৌড়ে এই দুঃস্বপ্ন থেকে বেরোনো যাবে কি? ও জানেনা।

ঐতো দেখা যাচ্ছে বিটঠল মন্দিরের চুড়ো, ঐযে পাথরের চাতাল, ঐতো পুরন্দর দাসের মন্টপ।

দৌড়ে দৌড়ে নদীর কাছের দালান টায় যায় সৌম্য। এখান থেকেই সব শুরু হয়েছিল।

থামের সামনে পৌঁছতেই আবার মাথাটা ঘুরে যায় ওর.. 

চোখ মেলে তাকিয়ে দেখে সামনে শান্ত নদী তিরতির বয়ে চলেছে। 

অপার্থিব সেই কনে দেখা আলোর গোলাপি কমলা রঙে নদীর জল, পাথর, ঘাস, ফড়িং, সমস্ত চরাচর ভিজে রয়েছে। 

ওর সারা গা ঘামে ভেজা, মেলে রাখা পায়ে ব্র্যান্ডেড কিটো, পরনে ধুতির বদলে খাকি রঙের চেনা জগার্স। ঘামে চুপচুপে হলেও, ওর গায়ে ফুরফুরে সুতির টিশার্ট।

স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ও।

স্বপ্ন দেখছিলো, স্বপ্নই ছিল ওটা.. উফফ কি অসম্ভব রোলারকোস্টার স্বপ্ন একটা।

ভালো করে আড়মোড়া ভেঙে উঠে দাঁড়ায় সৌম্য। এই ট্রমা কাটাতে কালকের ক্যাফেটায় গিয়ে প্রথমে একটা এসপ্রেসো খেতে হবে.. আর তারপর কালকের সেই চমৎকার মাশরুম পাফ দিয়ে ভ্যানিলা হ্যাজেলনাট ফ্র্যাপেটা। 


ঘাম মোছার জন্য পকেট থেকে রুমালটা বার করতে গিয়ে পকেট থেকে কিসব পড়ে যায়..

অবাক, অত্যন্ত অবাক হয়ে সৌম্য তাকিয়ে দেখে, কালো পাথরের মেঝের ওপর গোলাপি আলোয় মাখামাখি হয়ে ছড়িয়ে রয়েছে, এক রাশ সাদা আর কমলা ফুল। 

কিছুক্ষণ আগেই যার নাম জেনেছে ও..

মল্লী 

আর কনকাম্বরম !

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

সমান্তরাল

জন্মসূত্রে পাওয়া