সমান্তরাল
অটোতে বসে ঘড়ি দেখে নেয় কল্পনা। সাড়ে তিনটে বাজে, বাড়ি ঢুকতে চারটে হবে। বুড্ঢাটার বাড়ি ঢুকতে এখনো অনেক দেরি। কিন্তু পাঁচটার দিকে রুমিদি, লিপিদিদের আসার কথা আছে.. সময় আছে এখনো।
হাতের প্লাস্টিকে মধু, বালিশের ওয়ার, হ্যাঙ্গার, এরম হাবি জাবি কয়েকটা জিনিস কেনা আছে। দরকারি জিনিসের মধ্যে ফ্রোজেন ফিশ ফিঙ্গার। আজ চায়ের সাথে ভেজে দেবে ওদের।
বাইরে গেছিল, তার একটা ন্যায্য কারণ থাকাটাও প্রয়োজন।
অটোটা লোক তোলার জন্য দাঁড়িয়ে আছে তো আছেই।
বাঁ হাতের রুমালটা দিয়ে গলার আর কপালের ঘাম মোছে কল্পনা, যা প্যাচপ্যাচে গরম কলকাতায়।
সকাল থেকে মেঘলা গুমোট করে রয়েছে। রোদ নেই, কিন্তু এই গুমোটের জন্য সেদ্ধ হচ্ছে মানুষ।
বাড়ি গিয়ে আগে গা ধুতে হবে। শাড়ীটাও জলকাচা করে দেবে একসাথে। বড্ড ঘাম লেগে গেছে, ছোপ পড়ে যেতে পারে।
জর্জেটের শাড়ী পরে বেরিয়েছে আজকে। গরমে নাকি জর্জেট ভাল। যত্ত বাজে কথা.. এগুলোতে গরম লাগে খুব, ঘাম টানেনা একদম। কিন্তু ভাঁজে ভাঁজ পড়ে কুঁচকে যায়না.. খোলা পরা করতে অসুবিধা হয়না। তাই এই দিন গুলোতে এইসব শাড়ীই পরে কল্পনা।
আগে আগে সিনেমা হলে যেতো ওরা, হাওড়ার একটা মলে। কলকাতায় কে কখন দেখে ফেলবে। কাপল সিটে বসত বেশিরভাগ। মাঝে মাঝে, না পেলে, কর্নার সিট। বিয়ের আগে প্রেম করা হয়নি কল্পনার। এখন হয়ে যাচ্ছে সব অভিজ্ঞতা। ফিক করে একটা হাসি বেরিয়ে পড়ে ওর।
গত কয়েকবার ওরা হোটেলে গেছে। হলে খানিক ছোঁকছোকানি বাদে কিছুই করা যায়না, দুজনেরই আর সামলে রাখার ইচ্ছে করছিলনা। তাছাড়া হলে মলে বেশিরভাগই অল্পবয়েসী ছেলেমেয়েদের ভিড়.. তাদের মাঝে একটু কেমন কেমনও যে লাগতোনা তা নয়। তাই এটা নতুন ব্যবস্থা হয়েছে। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে হোটেল বুক করে, সবই বেশ হাই ফাই।
উৎপলের মাইনে আর উপরি নিয়ে ভালই এলেম আছে, হয়তো তাকে ইমপ্রেস করাটাও একটা উদ্দেশ্য।
মালটা অফিস থেকে ক্লায়েন্ট মিটিংয়ের নাম করে বেরোয়। দু তিন ঘণ্টা কাটিয়ে অফিস ফেরে। প্রায় মাসেই একদিন করে কাট মারে, তাও কারুর চোখে লাগেনা। কিরকম ঝাঁটের অফিস কে জানে।
মাসে একবার অন্তত উৎপলের কল্পনাকে চাইই চাই।
প্রেম? নাকি শরীরটাই আসল? কে জানে?
আর জেনে ও ছিঁড়বেই বা কি.. এই তো বেশ চলছে। ভালোই লাগে। লাগুক। ভাবনার কিছু নেই।
এমনিতেও ভাবতে শুরু করলে গা জ্বলে যায়। সারা জীবনটা তো কিছু না পেয়ে পেয়েই কেটে গেলো। কোন শখ টা পূরণ হয়েছে ওর?
বুড়ো ভামটার না আছে রূপ, না আছে শখ, না আছে পয়সা, না আছে মুরোদ। বুড্ঢাটার কথা মনে পড়লেই রাগ মাথায় উঠে যায় ওর। নিজের মা বাপের ওপর রাগ, দেবুদার ওপর রাগ, অদৃষ্টের ওপরে রাগ।
কলেজে, পাড়ার কালভার্টে ওকে হেঁটে যেতে দেখলেই আশেপাশে তোলপাড় লেগে যেত, ও জানে। কত ছুঁড়ে দেওয়া শব্দ, উড়ে আসা গান ওর গায়ে এসে লাগতো। অন্তত দশটা লুকিয়ে রাখা প্রেমপত্র এখনো রয়ে গেছে ওর কাছে। কিন্তু প্রেম করা হয়নি।
তখনকার দিনে এমনিতেও প্রেম করাটা ওদের ছোট শহরে ভালো চোখে দেখা হতোনা, তারপর মাটা ছিল ভয়ের ডিপো। মেয়ে কখন আলতু ফালতু ছেলের সাথে ফুড়ুৎ হয়ে যাবে এই ভয়ে অনার্স পেরোবার পরেই তড়িঘড়ি বিয়ে লাগিয়ে দিলো। আর দেবুদারও বলিহারি যাই..লোক পেলিনা আর সম্বন্ধ আনার। দেখে শুনে কল্পনারই ঘাড়ে ঝোলাতে হলো ওই বোঝা।
সরকারি চাকরি, কলকাতা শহরে নিজের বাড়ি, শ্বশুর শাশুড়ির ঝামেলা নেই… আনন্দে ড্যাং ড্যাং করে বিয়েটা দিয়ে দিলো বাবা মা। কল্পনার অমত টাকে ধরলোই না।
সব ওই বুড়োবুড়ির দোষ.. নাহলে ওর মতো মেয়ের এরকম বিয়ে হয় কখনও। জামাইবাবুও ব্যাংকের অফিসার .. শৌখিন মানুষ, পোশাক পরিচ্ছদ, স্টাইল মেনে চলে। আর দিদির ওইরকম বিয়ের পর কল্পনার জন্য এই ম্যাড়ম্যাড়ে পাত্র।
বারো বছরের ফারাক জেনেও কল্পনা তখন নিমরাজি হয়েছিল খালি এই ভেবে, যে সুন্দরী যুবতী বউয়ের আঁচলে বাঁধা থাকবে বুড়ো বর। কিন্তু নিরঞ্জন সরকারের ঢ্যাঁটামি আর ধ্যাষ্টামির কথা কেই বা ভাবতে পেরেছিলো। বুড়োর মুরোদ নেই এক ফোঁটা, খালি বড় বড় বাতেলা মারাচ্ছে।
কতবার চাকরির জন্য লোকজনকে ধরতে বলেছে। বউয়ের জন্য কারুর উমেদারি করতে পারবেননা উনি, এসেছেন বড় হরিদাস পাল। নিজের চেষ্টায় চাকরি জোগাড় করো, বলেই খালাস।
নীতি, বিবেক, আদর্শ, দর্শন…খালি বুলি কপচে কাটিয়ে দিলো সারা জীবন। ওই বুকনি ধুয়েই জল খাক ঢ্যামনাটা।
কল্পনা ওর ঘরে থেকেই যা করার করবে.. ওর নিজেরটা ওকে নিজেকেই বুঝে নিতে হবে। ফুড়ুৎ হবার মতো গাধার বুদ্ধি ওর নয়.. যে উড়ে গেলো আর সব খোয়ালো।
এখনো টানটান আছে শরীর। এখনো সুন্দরী বলে আশপাশে সবাই ওর নাম করে। চোখের পাশে চামড়া একটু ঢিলে হচ্ছে, কিন্তু এখনো বয়েসের ছাপ বোঝা যেতে দেরি আছে।
অফিস ফেরতা ভিড়টা শুরু হতে এখনো ঘণ্টা খানেক বাকি, রাস্তা এখন ফাঁকা, সামনে একটা ছেলে বসতেই অটোওয়ালা চালিয়ে দিয়েছে।
মুখ ঘুরিয়ে দেখে নেয় কল্পনা। পেছনের সীটে খালি দুজন। ওদিকের ইয়ং মেয়েটা ফোন থেকে মুখও তুলছেনা, যেন ওর মধ্যেই জীবনের সব মধু লুকিয়ে আছে। মৌয়ের বয়সিই হবে। তারও একই হাবভাব। মুখ তুলে দরকারের বেশি একটা কথাও বলেনা। কিছু বললে সোজা মুখে উত্তর দেয়না।
বাপের সাথে তাও ভালোভাবে কথা বলে, কিন্তু এমন ভাব করে যেন মাকে চেনেই না।
কথায় বলে ঘরের শত্রুর বাড়া কোনো শত্রু হয়না। পড়াশুনায় ভালো বলেই তো এত নাক তোর!
ওই গাঁইয়া বাপের কুলের জোরে হতো? সব তো গেঁয়ো ভূতের দল। যার দৌলতে এর কিছু শিখলি, যে জন্ম দিলো, বড় করলো, সেই মাকে এত অছেদ্দা। নেমকহারাম বেইমান কোথাকার।
অটোটা এইটবির জট থেকে বেরিয়ে দৌড়োচ্ছে। সুন্দর মুখটা বিতৃষ্ণায় বাঁকিয়ে চোখ বাইরে রাখে কল্পনা।
***
ঘেন্নায় নীহারিকার শরীরটা সেই থেকে গুলিয়ে গুলিয়ে উঠছে। আগেই ব্লু জাভার বাথরুমে একবার বমি হয়ে গেছে।
আর কোনোদিন ব্লু জাভায় ঢুকতেও পারবেনা মনে হয়। ভার্জিন মোহিটো সারা জীবনের মত তেতো হয়ে গেছে ওর।
আজকের দিনটা ওর কুড়ি বছরের জীবনের সবচেয়ে খারাপ দিন।
অটোটা দৌড়চ্ছে। ভাগ্যিস ধারে বসেছে, বাইরের দিকে মুখ করে গরম হাওয়াটাতেই বড় বড় শ্বাস নেয় ও। বিবমিষা টুকু সামলে গেল।
ওরা পাঁচজন কলেজ থেকে প্রিন্সেপ ঘাটে যাবে বলে বেরিয়েছিল। প্রায়ই যায়, নতুন কিছু না। গিয়ে ঘাটে বসে আড্ডা মারে। কারুর পকেটে পয়সা থাকলে মাঝেমধ্যে নৌকো করে আধ এক ঘন্টা ঘুরে নেয।
আজকে গুমোটের চোটে সিঁড়িতে বসে থাকা যাচ্ছিলনা। এক ফোঁটা হাওয়া নেই, হিউমিডিটির চোটে সুস্থ মানুষের ব্রেনের চারপাশে ঘাম জমে যাবে।
ওরা তাই ব্লু জাভায় চলে গেছিল, কুহুর সেমিস্টার রেজাল্টের ট্রিট। বিনুর বাইকে ও, আর আরেকটা বাইকে সব্য আগে পিছে করে একসাথেই চলে এসেছিল। মাঝ রাস্তায় সিড আর কুহু কোথায় পিছিয়ে পড়ল।
ওরা তিনজন এসে আজ ক্যাফের পেছনের দেওয়ালের সোফাটা পেয়ে গেছিল, এদের বেস্ট সীট। ঢোকার দরজাটা আলাদা করা হলেও আসলে এটা ব্লু প্যালেস হোটেলের ক্যাফে। কাঁচের দেওয়ালের পেছনটায় লবির একটা ডেকরেটিভ কর্ণার আছে। ভার্টিকাল গার্ডেন করা একটা প্যানেল, নিচে ব্লু হেক্সাগোনাল টাইলস, ঝুলন্ত স্ফিয়ার ল্যাম্প শ্যান্ডেলিয়ার। ঠিকঠাক অ্যাঙ্গেল করে তুলতে পারলে দারুণ ফটো আসে।
কুহু গ্রুপে মেসেজ করলো, ওদের পনেরো কুড়ি মিনিট দেরি হবে, ফুচকা খেতে দাঁড়িয়েছে। ফুচকার নাম করে কি কি খাচ্ছে, এই নিয়ে খিল্লি হচ্ছিল। সব্য বলল, কুহু নিশ্চয়ই ট্রিট দিতে চায়না বলে কেটে পড়েছে। বিনুর বক্তব্য ছিল, কুহুর ঘাড় ভেঙে ফুচকাটাও বাদ থাকে কেন, দেরির অপরাধের সাজা চাই।
এসিতে শরীর জুড়িয়ে যাচ্ছিল, হাহা হিহির মধ্যেই অর্ডারটাও এসে গেছিল। ভার্জিন মোহিটো ওর ফেভারিট। বরফ ঠান্ডা পুদিনা গন্ধী টক মিষ্টি তরলটা ওর গলা বেয়ে নেমে যাচ্ছে, ও স্পষ্ট বুঝতে পারছিল। এই অনুভূতিটা ওর দারুণ লাগে, গলা বেয়ে শীতল শান্তিটা কেমন পেট অবধি চলে যায়। ওর হেলমেটটা টেবিলের ওপর থেকে সরিয়ে সীটের ওপর রাখতে উঠে দাঁড়িয়েছিল। তখনই চোখে পড়ল লবির পেছনের দৃশ্যটা। লিফ্ট থেকে মা আর উৎপল মাইতি বাইরে বেরোচ্ছে। লিফট লবি পেরিয়ে রিসেপশনের কাছাকাছি এসে লোকটা মায়ের কোমর জড়িয়ে থাকা হাতটা সরিয়ে নিলো। তারপর দুজন একটু আলাদা আলাদা হয়ে মেন এনট্রান্সের দিকে চলে গেলো। এদিকটায় তাকায়নি ওরা।
ভীষণ চেনা ডাস্টি পিংক শাড়িটা চোখের কোণে মিলিয়ে যেতেই নীহারিকার পুরো সিস্টেমটা বিদ্রোহ করলো। রিফ্লেক্সে পেটটা সঙ্গে সঙ্গে গুলিয়ে উঠলো, মাথাটা দপদপ করতে শুরু করলো। একটু আগে ঠান্ডা হওয়া শরীর ঘামে ভিজে যাচ্ছে। কয়েক মিনিট কেটেছিল হয়তো, কিন্তু ওর মনে হয়েছিল বোধহয় ঘণ্টা খানেক হয়ে গেছে। নট ফিলিং ওয়েল…শব্দগুলো কোনো রকমে উচ্চারণ করেই উইমেন্স রুমে দৌড়েছিল ও। লাঞ্চের চাউমিন, চিলি চিকেন, টক জল আর কান্না একসাথে বেরোচ্ছিল।
ওর মনে পড়ে যাচ্ছিল কয়েক মাস আগে পাড়ার ক্লাবের অ্যানুয়াল ফাংশনের সন্ধ্যে। উইংসের পেছনে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ছিলো অনুষ্ঠানের ঘোষক আর ঘোষিকা, এই একই দুটো চরিত্র।
সে সময় আর কারুর ওখানে থাকার কথা ছিলোনা। কিন্তু নাচের সময় দুলটা কোথায় পড়ে গেছিলো, সেটা খুঁজতে ও ব্যাকস্টেজে চলে গেছিলো। স্টেজে তখন শ্যামা চলছে, নাচের এত লোক পাওয়া যায়নি, তাই গীতিনাট্য। সবার পূর্ণ মনোযোগ সেদিকেই। খুঁজে খুঁজে দুলটা স্টেজের পেছনের দেওয়াল ঘেঁষে পড়ে থাকা তারের গাদার মধ্যে থেকে পাওয়া গেছিল। কুড়িয়ে চলেই আসছিলো, যখন ও উইংসের আড়ালে দাঁড়ানো দুজনকে দেখেছিল। স্টেজের জমজমাট আওয়াজে ওরা পেছনে পায়ের শব্দ শুনতেও পায়নি। দুজনের মুখই স্টেজের দিকে, কিন্তু পেছনে উৎপলের হাত, ওর মায়ের ডিপ কাট ব্লাউজের খোলা পিঠে ঘুরছে, মাঝে মধ্যে খামচে ধরছে। আর তাতে মায়ের ভাবভঙ্গির মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া, কোনো অস্বস্তি বা অভিযোগের ইঙ্গিত নেই..যেন অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপার, শ্বাস প্রশ্বাসের মত।
সেদিনও ওরা জানতে পারেনি। দু এক মিনিটের মধ্যে স্টেজের নিচে চলে এসেছিল নীহারিকা।
ওর একসাথে রাগ.. অবিশ্বাস.. প্যানিক.. বুক ধড়াস ধড়াস.. সব হচ্ছিল। এটা কিভাবে সম্ভব? দুটো ভদ্র বাড়ির লোক এরকম করবে? প্রকাশ্যে? কিভাবে পারছে?
সেদিনের পর থেকে ওর মনের মধ্যে একটা যুদ্ধ চলছে। ও কি ভুল দেখছিল? ও কি ভুল ভাবছে? ওর যেটা মনে হচ্ছে, সেটা নিশ্চয়ই মিথ্যে। নাকি ও ইচ্ছে করেই সত্যিটাকে মিথ্যে বানাবার চেষ্টা করছে?
এই কমাসে ও আর মায়ের সাথে ঠিক করে কথা বলতে পারেনি। কখনও মা কাঠগড়ায় দাঁড়াচ্ছে, কখনও ও নিজেই কাঠগড়ায় দাঁড়াচ্ছে। কখনও মার যাবজ্জীবন হচ্ছে, কখনও বেকসুর ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে।
সত্যিটা এটাই, যত দিন যাচ্ছে, ওর আরও অনেক ছোট ছোট ব্যাপার চোখে পড়ছে, কানে আসছে। কখনও টুকটাক ছোঁয়া, কখনও গলার স্বরে পরিবর্তন, কখনও দুজনের কথোপকথনে ‘আপনি’র জায়গায় একটা বেফাঁস ‘তুমি’... ওর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় নিশ্চিত। খালি মন মানতে চাইছিলনা। আজ আর কোনো সন্দেহের অবকাশই রইলনা। অথচ কি কোয়েন্সিডেন্স, ওই মুহূর্তে হেলমেট ওঠানোর জন্য না দাঁড়ালে দৃশ্যটা চোখেই পড়তনা ওর।
বাথরুম থেকে এসে ও ক্যাফে থেকে বেরোবার কথা বলেছিলো অনেকবার, এই জায়গাটা থেকে দূর হয়ে যেতে ইচ্ছে করছিল। বন্ধুরা চিন্তিত হয়ে পড়েছিল ওকে দেখে। শরীরটা খুব খারাপ লাগছে তোর? সত্যি যে ভ্যাপসা গরম। ওরা ওকে বাড়ি পৌঁছে দেবে বলছিলো। কিন্তু বাড়ির নামেই বমি পাচ্ছিলো আবার। শেষে কুহুর বাড়িতে গিয়ে হাত পা মেলে বসেছিল ওরা।
এখন নটা বাজে, সব্য বারবার বলছিল, বাইকে করে নামিয়ে দিয়ে যাবে। কিন্তু কারুর সাথে হাবজি গাবজি কথা বলতে আর একটুও ভালো লাগছিলনা। তাই একাই ফিরল ও। বাড়ির বাসস্টপে নেমে গুটি গুটি হাঁটছিলো নীহারিকা, যেন শাস্তি পাবার জন্য হেডস্যারের ঘরের দিকে যাচ্ছে।
কলকাতা এখনো গুমোট। আর ওর মাথার আকাশ জুড়েও অভেদ্য মেঘ জমে আছে।
বাড়ির সামনে এসে মুখ তুলতে চোখে পড়ে, দোতলার বেডরুমের জানলার গ্রীল থেকে ঝুলছে ডাস্টি পিংক রঙের জংলা জর্জেটের শাড়িটা।
***
বিশ্রী শব্দ করে একটা বড় ঢেকুর ওঠে। আশাকরি কেউ শোনেনি। আশপাশে তাকিয়ে একবার দেখে নেয় দীপ। তবে ঢেকুরটা ওঠার পর শরীরে হাঁফধরা অস্বস্তিটা কেটে গেলো। লাইনে এসে দাঁড়াবার পর গুনে দেখেছিলো সামনে ন’জন, ও দশ নম্বর। তার মানে দুটো অটো গেলে, তৃতীয়টায় ওর জায়গা হবে। তারপর পাঁচ সাত মিনিট কেটে গেছে, তবু একটাও অটোর দেখা নেই.. এরই মধ্যে ওর পেছনে আরো জনা পাঁচেক জমে গেছে। এই রাত সাড়ে দশটায়ও এত লাইন।
এই রুটে অবশ্য সকালের অফিস টাইমের পর থেকে বিকেল চারটে অবধি সময়টুকু বাদ দিলে রাত পর্যন্ত এরকমই ভিড় থাকে। এই লম্বা লাইনে দীপ রেগুলার। অটোওয়ালারাও প্রায় সবাই মুখ চেনা।
একটা অটো ওদিকে লোক নামিয়ে ইউ টার্ন নিতে সিগন্যালে দাঁড়িয়েছে। লাইন একটু এগোলো তাহলে।
আরেকটা ছোট ঢেকুর উঠলো।
পেট বেশ ভরা, বাড়ি গিয়ে ফ্রেশ হয়ে সোজা এসিতে ঢুকে দেহ ফেলে দেবে। আজ ম্যাডামের সাউথ ইন্ডিয়ান খাবার ইচ্ছে হয়েছিল। সানরাইজ থেকে বেরিয়ে দুজনে অদিতির বাড়ির কাছের সাউথ ইন্ডিয়ান ক্যাফেতে গিয়ে বসেছিল। খাবোনা খাবোনা করেও একটা লম্বা পেপার মশলা দোসা খেয়ে ফেলেছে, আর পরপর দুটো ফিল্টার কফি।
দুধ আজকাল আর হজম হতে চায়না। চা-কফি দুধ চিনি ছাড়াই খাওয়া অভ্যাস করে ফেলেছে। শুধু এই ফিল্টার কফির লোভটা সামলানো যায়না।
দক্ষিণী স্টাইলে স্টিলের বাটি আর কানাওয়ালা গ্লাসে সুগন্ধি, কড়া ফেনায়িত ফিল্টার কফি। ব্যাঙ্গালোরের দিনগুলো মনে পড়ে যায়..সুখের সাথে নস্টালজিয়া মাখামাখি।
অদিতির নানা বিষয়ে প্রচুর আগ্রহ। সেসব নিয়ে তার কিছুদিন গভীর চর্চা চলে। তারপর আবার ইন্টারেস্ট বদলে যায়। গত দুমাস ওর মাথায় চলছিল গ্রিন এনার্জি, এনার্জি কনজারভেশন, এইসব। পেট্রোল ডিজেলের বদলে ইভি কেনা দরকার, সোলার প্যানেল কিভাবে কেনা যায়, বাড়ির ছাদে বা দেওয়ালে সেসব লাগানো যায় কিনা এসব নিয়ে অনেক গবেষণা করে অবশেষে নিজের ঘরের ফ্যান বদলে নাকি এনার্জি সেভিং ফ্যান কিনে ফেলেছে। তারপর থেকে আবার ভাবনার বিষয় বদলে গেছে। কদিন আগে আইস এজ সিরিজটা দেখলো। আর তারপর আজকাল আইস এজের ইতিহাস নিয়ে পড়াশুনা চলছে।
ওর সাথে থাকলে নিজস্ব কোনো চিন্তার সুযোগ পায়না দীপ। মেয়েটা ওকে ছেয়ে থাকে। অবশ্য সেটা ও সাথে না থাকলেও হয়। সারাটা সপ্তা ও এই দুটো দিনের মুখ চেয়ে কাটিয়ে দেয়। অথচ খানিকটা অনিচ্ছেতেই টিউশন ক্লাস নিতে রাজি হয়েছিল ও। বাড়ির রাস্তাতেই, এক্সট্রা জার্নি করতে হবেনা, এটা একটা প্লাস পয়েন্ট ছিল। জয়েন করে তখন সবে কিছু মাস হয়েছে ওর সানরাইজ টিউটোরিয়ালে। বুধ, শুক্র.. দুজনের একই দিনে ক্লাস থাকতো বলে ফিজিক্সের অদিতি মিত্রের সাথে পরিচয়। ক্লাসের আগে পরে কিছু কথাবার্তা, সেখান থেকে আড্ডা আর একটা ভালোলাগা। প্রথম থেকেই ওর সোজা সাপটা খোলামেলা স্বভাবটা খুব ভালো লেগেছিল দীপের। কোনো আড়ম্বর নেই, কোনো ভনিতা নেই। আর ভালো লেগেছিল হইহই করা ঝলমলে হাসিটা।
তারপর একদিন রিসেপশনিস্ট গৌতম বিয়ে করলো। আর সেই একটা সন্ধ্যায় দীপের পুরো দুনিয়া বদলে গেলো।
ব্যারাকপুর থেকে বউভাত খেয়ে ফেরার সময় দমদমে মেট্রো ধরেছিল ওরা। উল্টোডাঙ্গায় মিত্রা ম্যাডাম নেমে যাবার পর পুরো রাস্তাটা শুধু ওরা দুজনই ছিল।
সেদিন গোটা সন্ধ্যেটা খুব উদাস ছিল অদিতি। বাকিরা বুঝতে না পারলেও, দীপ লক্ষ্য করেছিল, অদিতির অন্য সময়ের হাসিগুলোর মত সেদিনের হাসিগুলো প্রাণোচ্ছল নয়। চোখে হালকা একটা স্বভাব বিরুদ্ধ আড়াল, যার পেছনে মনখারাপের আবছা ইঙ্গিত। মেট্রোর সুড়ঙ্গের দিকে বোবা তাকিয়ে ছিল অদিতি। অনেক দ্বিধার পর শেষ পর্যন্ত জিজ্ঞেস করেই ফেলেছিল দীপ, তুমি আজ এত উদাস কেন?
অদিতি চোখ ফিরিয়ে বলেছিল, এত স্পষ্ট? তোমরা সবাই কি বুঝতে পারছ?
দীপ বলেছিল, সবার কথা জানিনা, কিন্তু আমার চোখে পড়ল। তারপর অদিতি অনেক কিছু বলেছিল। একটা ভাঙা সম্পর্ক, ব্যর্থ কয়েকটা বছর, বেশ কয়েকটা কঠিন সিদ্ধান্ত মিলিয়ে ওর একলা জীবনের কথা জানিয়েছিল ও। ‘কি হয়েছে’, ‘কেন হয়েছে’ পেরিয়ে ওর আবেগটা এসে আঘাত করেছিল দীপকে।
--সবসময় হয়না, কিন্তু মাঝে মাঝে এক একটা অনুষ্ঠান বাড়িতে গিয়ে হইহুল্লোড় দেখলে আমার ফেলে আসা সম্পর্ক গুলোর জন্য খুব কষ্ট হয়। আজ সেরকমই একটা দিন ছিল।
এই কথাগুলো বলার পর যখন ওর দিকে তাকিয়েছিল, দীপ দেখতে পেয়েছিল, অদিতির চোখের কোনায় একটা টলটলে বিন্দু চকচক করছে।
মুখে কোনো কথা না এলেও, ওর হাতটা নিজের দুহাতের মধ্যে টেনে নিয়ে হালকা একটু চাপ দিয়ে ছেড়ে দিয়েছিল দীপ।
সে রাতে, অদিতিকে ওর বাড়ির বাস স্টপে ছেড়ে আজকের মতোই অটো করে বাড়ি গেছিল। জানুয়ারির ঠান্ডা হাওয়া ওর মুখে এসে লাগছিল, আর সন্ধ্যার কথা গুলোই মনে ভিড় করছিল। মনে হয়েছিল, অদিতির প্রাণখোলা হাসির ভাগ তো সবাই পায়। কিন্তু তার পেছনে লুকোনো কষ্টগুলো জানতে পারাটা কোনো এক অদ্ভুত হিসেবে হয়ত একটা প্রিভিলেজ।
কোথাও একটা চোরা টান হয়ত আগে থেকেই ছিল। সেটার উৎস কোথায়, অনেক দিন অনেক ভেবেছে দীপ। খুঁজে পায়নি। অদিতি আহামরি সুন্দরী না, চটক নেই, প্রচণ্ড গ্ল্যামার, এমন না। কথায় বার্তায় বুদ্ধিদীপ্ত, কিন্তু সেতো অনেকেই। হাল ছেড়ে দিয়েছে দীপ। একজনের প্রতি আরেকজনের টান কি এভাবে বিশ্লেষণ করা যায়? অল ইট টুক ওয়াস আ মেট্রো রাইড।
নাকি একটা জলবিন্দু?
এত রাতেও হাওয়া বেশ গরম। পরপর দুটো অটো এসে যেতে লাইন তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেছিল। ওর অটোর পেছনে একটা বাসও দৌড়ে দৌড়ে আসছে। হর্ন দিয়ে কান ঝালাপালা করে দিচ্ছে। শেষ লপ্তের রাস্তাটুকু এরা এরকমই দৌড়ায়। একটা বিশ্রী গালাগালি ঠোঁটের আড়ালে চেপে ড্রাইভার সাইড দিতেই, ব্যস্ত বাস হর্ন দিতে দিতে ঝড়ের বেগে এগিয়ে গেল। পেছনের সিটে এক মহিলা বলে উঠলেন, অলিম্পিকে ইন্ডিয়ার চান্স আছে মনে হচ্ছে। মুচকি হাসলো দীপ।
আজ বিকেলেই দীপের এই রুটের বাসের অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে একবার। পেছনে একই রুটের আরেকটা বাস চলে এসেছে, তাই তাকে টেক্কা দিতে রকেটের মত ছুটছিল ওর বাসটা। দীপ অতি কষ্টে ব্যালেন্স করে দাঁড়িয়েছিল।
বসার জায়গা না পেলেও ভিড় ছিলোনা, তাই দাঁড়িয়ে থাকতে অসুবিধা হচ্ছিলনা। কিন্তু ওই খালি কৌটোয় পড়ে থাকা লাস্ট কয়েকটা বিস্কিটের মত ওকে ঝাঁকিয়ে দিচ্ছিল একদম।
সচরাচর ও বাসে ওঠেনা, অটোতেই ও স্বচ্ছন্দ, বিশেষ করে এই রুটে। কিন্তু আজ সানরাইজ যাবার সময় অটো দাঁড়িয়ে আছে দেখে উঠতে গিয়েও পিছিয়ে এসেছিল। পেছনে একটা বাস আসছে দেখে আর কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা উঠে পড়েছিল।
অপেক্ষমান অটোর পেছনের সিটে কল্পনা সরকার বসে হাতের প্যাকেট ঘাঁটাঘাঁটি করছিল।
ওদের পাড়ার মহিলাদের একজন। এদের পুরো গ্রূপটাই বিরক্তিকর, বস্তাপচা, পরের চরকায় নাক গলানো পিএনপিসি ধরনের। তারমধ্যে এই মহিলা একটু বেশীই গায়ে পড়া। তাছাড়া একবার একটা উড়ো কেচ্ছাও কানে এসেছিল এনার আর এদের ক্লাবের সেক্রেটারির নামে। সত্যি হওয়া অস্বাভাবিক না, মহিলা যেরকম ঢলানি টাইপ। সেক্রেটারি উৎপল মাইতিটিও বর্ণময় মানুষ। খচ্চর টাইপ চোখের দৃষ্টি।
পাড়ায় থাকলে একটু লোক লৌকিকতা রাখতেই হয়। কিন্তু এসব লোকজনকে দুচোখে দেখতে পারেনা দীপ।
টক্সিসিটি এভয়েড করাই ভালো। তাই ওই অটোয় ওঠেনি বিকেলে। বিশ্রী লোকগুলোর ভাবনা এড়াতে চোখ বুজলো দীপ। প্রিয়তম দৃশ্যটা মনে মনে দেখে নিলো একবার। দুটো বাঙ্ময় চোখের কোলে চিকচিকে একটা জলের বিন্দু।
***
ঝমঝম শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো তিতিরের। নাকি ঘরের বদ্ধ হাওয়ায়। মোবাইলটা তুলে দেখে নিল, দুটো সতেরো। ঘর ঠান্ডা হবার পর এসি বন্ধ করে ঘুমিয়েছিল বলেই বৃষ্টির আওয়াজটা শুনতে পেলো। নাহলে ওই যান্ত্রিক গুনগুনানি ছাপিয়ে শোনা যেতনা। আজ খুব ক্লান্ত ছিল, তাড়াতাড়ি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। এখন অবশ্য ক্লান্তিটা কেটে গেছে মনে হচ্ছে। জানালাটা খুলে দিতেই ঝম ঝম শব্দটা হইহই করে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল। তার সাথে ভেজা হাওয়া আর বৃষ্টির গন্ধ।
এই ফ্ল্যাটের জানালাগুলো বেশ বড় বড়। আর তাদের নিচে চওড়া মার্বেল বাঁধানো পাড়।
সেখানেই বসে বসে বৃষ্টির ছাঁটে ভিজতে শুরু করলো তিতির।
চারতলায় জানালা, বাইরে অঝোর বৃষ্টি, ভেজা মাটির না হলেও, উত্তপ্ত কংক্রিটের সাথে বৃষ্টির ফোঁটারা যুদ্ধ করে সোঁদা একটা গন্ধ ছড়িয়েছে। সব মিলিয়ে নেশা লেগে যাওয়ার কথা। বসে বসে আরামটা গায়ে মেখে নিচ্ছিল তিতির। কাল ফোর্থ স্যাটারডে, ছুটিও আছে। রাত জাগতে অসুবিধা নেই।
সারা দিনের গুমোট কাটিয়ে বৃষ্টি নেমেছে, কলকাতাবাসী আজ রাত টুকু আরামে ঘুমোবে।
এই ফ্ল্যাটের সামনে বড় রাস্তা পর্যন্ত সব বাড়িই একতলা বা দোতলা। তাই সামনে কয়েকটা ঝাঁকড়া গাছ বাদ দিলে বেশ অনেকটা দেখা যায়।
সেই অনেকটা এখন বৃষ্টির সূক্ষ্ম চাদরে ঢাকা পড়ে গেছে। বড় রাস্তার বিলবোর্ডগুলো আবছা, মোড়ের মাথার কদমগাছটা আবছা, বুকাইদের আমগাছটা আবছা। সামনের স্ট্রিটল্যাম্পটার মাথায় আলোর হলদেটে আবছা মুন্ডু।
আগে তিতিরের একদম বৃষ্টি ভালো লাগতোনা। বর্ষায় ওদের বেহালার বাড়ির বাগানে জল জমে যেত। কাদা আর জল পেরিয়ে সারা জীবন স্কুল কলেজ করেছে ওরা। প্যাচপ্যাচে আবহাওয়া, স্যাঁতস্যাঁতে জামা জুতো.. কেঁচো উঠে আসতো চলার পথে, মাঝে মাঝে ঘরেও ঢুকে পড়ত। তাছাড়া বৃষ্টি হলেই অনিবার্য জ্যাম। আধ ঘণ্টার রাস্তা যাতায়াত করতে পঁয়তাল্লিশ পঞ্চাশ মিনিট। অসহ্য লাগতো ওর।
এখন চারতলায় ফ্ল্যাটের জানলায় বসে সেসব আর মনে হয়না। শুধু বিল্ডিংটা নয়, পাঁচিলের ভেতরে পুরো চত্তরটাই বাঁধানো। এখানে কাদা প্যাচপ্যাচ করেনা। এভাবে ওপর থেকে বৃষ্টি দেখতে বরং রোমান্টিক লাগে।
এই কথাটা মাথায় আসতেই হেসে ফেলে তিতির। বিষাদের হাসি।
রোমান্স। এখনো ওর মাথায় রোমান্সের কথা আসছে। কিভাবে কে জানে। কোন ধাতুতে তৈরি এই মাথা..?
গল্পটা চরম ক্লিশে। সারা জীবন গুড গার্লের ভূমিকা পালন করেছে তিতির। সমস্ত নিয়ম মেনে চলেছে।
পড়াশুনা করেছে। গান শিখেছে। ভালো রেজাল্ট করেছে। বাবা মায়ের সমস্ত কথা শুনেছে। তার নিয়মের জীবনে শুধু একটিবার বেনিয়মে ঢুকে পড়েছিল একজন। তার মতো অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ মেটিরিয়াল প্রেমে পড়েছিল। বন্ধুর দাদার মিশুকে হাসি আর উদাসী চোখ.. তিতিরই প্রেমে পড়েছিল। এমনকি প্রপোসালটাও ওই দিয়েছিলো। তার ম্যাড়মেড়ে জীবনের একমাত্র এডভেঞ্চার। সেই এডভেঞ্চার এখন অন্য ঘরে ঘুমোয়।
আগেও যে ও কোনোদিন তিতিরকে সেভাবে ভালবেসেছে, তা নয়। কিন্তু আগে বোঝেনি দীপের ওকে বলা হ্যাঁ টা কত বড় কম্প্রোমাইজ ছিল।
অবশ্য এতটা দূরত্বও আগে কখনও ছিলনা। প্রেম ঠিক সেভাবে না থাকলেও, বন্ধুত্ব ছিল, সাহচর্য ছিল, কাম ছিল।
অস্বীকার করে লাভ নেই, দীপ ধীরে ধীরে দূরে সরছিল। কতদিন, কত মাস, কত বছর যে একসাথে বসে কোনো অকাজের কথা বলেনি ওরা, কোথাও বেড়াতে যায়নি, কিচ্ছু করেনি, তার হিসেব নেই। তারপর হঠাৎ গত কয়েকমাস ধরে আলাদা ঘরে শোবার সিদ্ধান্ত। কাজের বাহানা দিয়েছিল দীপ। পেপার লিখতে হয় রাত অবধি, সেসব সেরে ঘুমোতে যাবার সময় তিতিরের ঘুম ভেঙে যায়, সকালে মাথা ভার হয়। আর তাছাড়া পা ছড়িয়ে বসে কাজ করতে আজকাল আরাম হচ্ছে দীপের, কিন্তু শোবার ঘরে বিছানায় বসে কাজ করলে, পাশে তিতির ঘুমোতে পারবেনা। আলো জ্বালিয়ে রাখা যাবে না, টাইপিং এর শব্দে ঘুম আসবেনা। তাই স্টাডিতে শোওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ।
অজুহাত বুঝেও একবাক্যে মেনে নিয়েছিল তিতির। অভিমানে একটাও অতিরিক্ত শব্দ উচ্চারণ করতে পারেনি। তারপর সাতদিনের মধ্যে নতুন সিঙ্গল খাট বিছানা গুছিয়ে অন্য ঘরে সরে গেলো দীপ।
নিঃশব্দে নিজের ঘরে সম্পূর্ণ একলা হয়ে গেলো তিতির। আনুষ্ঠানিকভাবে।
প্রথম কয়েক রাত সে ঠিক করে ঘুমোতেই পারেনি। কিন্তু খেয়াল করে দেখেছিল, দীপের মধ্যে কোনো ভাবান্তর নেই।
অনাসক্তিকে জোর করে আগ্রহেই বদলানো যায়না, ভালবাসা তো অনেক দূরের কথা।
আগে নিয়মমাফিক হলেও, সপ্তায়, দুসপ্তায় মিলিত হতো ওরা। দীপকে ছুঁতে, আদর করতে পারত তিতির।
গত কয়েকমাস দীপ বোধহয় ওর দিকে একবার তাকায়ওনি। অথচ তিতির বোকার মত দীপের বিছানা ঝাড়ার অছিলায় যেন ওর স্পর্শ নিয়ে এসেছে কতবার।
একবার ঘাড় ঘুরিয়ে সাইড টেবিলের ওপর রাখা নিজের বিয়ের ছবিটা দেখে তিতির। নিজের খুশি ঝলমলে হাসিটা দেখে, আর পাশে চশমার আড়ালে দীপের কেজো হাসির ভদ্রতাটাও। ছবির তিতিরের জন্য একইসাথে হিংসা আর করুণা হয় ওর।
চোখ ফিরিয়ে নেয়, ভেজা হাওয়ায় মুখ পাতে।
এত রাতে সারা পাড়া ঘুমোচ্ছে। অবশ্য এই মাঝরাতে ঘুমোনোটাই স্বাভাবিক। মুখ বাড়িয়ে একটু দেখতে গিয়ে কয়েকটা রাগী জলের ফোঁটা ওর কপালে পড়ল। সরকারদের দোতলার একটা জানলায় আলো জ্বলছে। বোধহয় মৌ রাত জেগে পড়াশুনা করছে। সামনে কি সেমিস্টার আছে? ওর খুব ভালো লাগে মেয়েটাকে। পড়াশুনায় ভালো, ব্যবহার ভালো, নাচে ভাল। ব্রাইট ইন্টেলিজেন্ট ভদ্র মেয়ে।
ওকে দেখে মাঝে মধ্যে নিজের কথা মনে হয় তিতিরের। অনেকটা যেন ওই বয়েসের তিতিরের মতো। তারপরই জোর করে ভাবনাটা সরিয়ে দেয় তিতির। নাহ্। আর কেউ যেন তিতিরের মত বোকা হাঁদা না হয়। কেউ যেন এমন ঠকে না যায়।
বৃষ্টি একটুও কমেনি। গুটিয়ে রাখা ইনসেক্ট স্ক্রিনটার বাঁধন খুলে জানলার চারকোনার ভেলক্রো লাগিয়ে উঠে আসে তিতির। ছেলের ঘরে গিয়ে জানলা খুলে নেট লাগিয়ে এসি বন্ধ করে। ছেলে অঘোরে ঘুমোচ্ছে, নড়াচড়াও করেনা।
দীপের বন্ধ দরজায় কান পাতে একবার। গমগমিয়ে এসি চলছে।
তারা মা ছেলে শোবার অনেক পরে ফিরেছে দীপ। নিজেই এসে চাবি খুলে ঢুকেছে, ফ্রেশ হয়েছে, ঘুমিয়েছে। আজকাল বুধ শুক্রের রুটিন এটাই।
কিচেনে গিয়ে জল চাপায়, কফি গোলে নিজের কাপে। ঘুমটা চটকে গেছে, কফি নিয়ে একটু বসবে। কোনো ধুমধাড়াক্কা ওয়েব সিরিজ দেখা যেতে পারে। মগজ বনবন করবে, তারপর ঘুমিয়ে পড়বে নাহয়। চাল ডাল ধুয়ে ভিজিয়ে দেয় তিতির। কাল ব্যাটার বানিয়ে রাখলে পরশু সকালে দোসা আর ইডলি বানানো যাবে। দীপ সাউথ ইন্ডিয়ান পছন্দ করে। কাল মনে করে সাম্বারের জন্য অড়হর ডাল ভেজাতে হবে, ফোনে রিমাইন্ডার সেট করে ও।
কফির মগটা নিয়ে ঘরে ঢুকতে যাচ্ছিল, হঠাৎ চোখে পড়ল বেডরুমের দরজার পাশে শোকেসের ওপর রাখা ব্রাউন কাগজের ঠোঙ্গাটা।
দীপ এনে রেখেছে নিশ্চয়ই। কি এনেছে? সংসারের কোনো কিছুতে তো তার কোনোদিনও মন নেই। কি হতে পারে?
ঠোঙাটা খুলে দেখে তিতির। একটা কাঁচের বোতলে চেনা লেবেলে ডুবন্ত সূর্যের ছটায় উদ্ভাসিত জলের পাশে নুড়ি সাজানো, নিচে লেখা বনসিজ আয়ুর্বেদিক সুদিং অয়েল।
চানের আগে সপ্তাহে একদিন এই তেলটা মাখা অভ্যাস তিতিরের। মাথায় ভালো করে ম্যাসাজ করে, এক ঘন্টা পর শ্যাম্পু করে। গত কুড়ি বছর ধরে করছে।
উপকার আদৌ হয় কিনা জানা নেই, হয়ত প্লেসিবো। কিন্তু তার কেমন যেন মনে হয় এই তেলটা মাখলে তার কম মাথা ধরে, কম চুল পড়ে, কম চুল সাদা হয়। সেন্ট্রাল এভিনিউয়ের একটা দোকান থেকে আগে বাবা এনে দিত, এখন জানিয়ে দিলে, ইউনিভার্সিটি থেকে ফেরার সময় দীপ নিয়ে আসে।
একমাস আগে শেষ বোতলটা খালি হয়েছে। দীপকে বলবে বলবে করেও বলেনি, ইচ্ছে করেনি।
কিন্তু সে নিজে থেকেই এনেছে।
নিশ্চয়ই চান করতে গিয়ে বাথরুমের তাকে খালি শিশিটা খেয়াল করেছিল।
তিতিরের কথা মনে মনে ভেবেছিল তখন। ও যে মনে করে তিতিরের জন্য কিছু করেছে, ভাবতে অবাক লাগে।
কফি হাতে আবার জানলায় এসে বসে পড়ে তিতির। বৃষ্টি ধরে গেছে, চারপাশ বেশ চুপচাপ, এমনকি একটা কুকুরও ডাকছেনা কোথাও। বড় রাস্তা থেকে খালি মাঝে মধ্যে হুশ হাশ গাড়ির আওয়াজ আসছে।
সরকারদের জানালার আলো নিভে গেছে।
অনেক অনেকদিন পর খুব আস্তে, প্রায় অস্ফুট মিহি স্বরে গুনগুন করে গান ধরলো তিতির।
You are talented. I like the style and flow…Keep this up!
ReplyDelete