দূরভাষ

রিসিভারটা তোলার সময় শেষবার ভাবলো ঋতবান, এক সেকেন্ড, আর তারপর শেষ দ্বিধাটুকু ঝেড়ে ফেলে ডায়াল করলো নম্বরটা..
বাজছে..
কে ধরবে?.. অচেনা কোনো গলা.. ?
নাকি চেনা গলা টাই...!!
কোন গলাটা চাইছে ও?
চেনাটা? মাঝেমাঝে মনে হচ্ছে, অচেনা গলা হলেই ভালো হয়..
আচ্ছা, গলাটা চিনতে পারা যাবে? যদি ভারী হয়ে গিয়ে থাকে? অনেকগুলো বছর পেরিয়ে গেছে মাঝখানে ..
টেনশন বাড়ছিল..
যেন প্রশ্নপত্র হাতে পাবে, সাজেশন মিলেছে না মেলেনি তার পরীক্ষা..


অনেক ভেবেছে, নিজেকে আটকাতে পারেনি।
বহুবার ভেবেছে, বহুদিন.. মাসের পর মাস কেটেছে, বছর ঘুরে গেছে। তবু মনস্থির করতে পারেনি। বারবার ফোন হাতে তুলেও রেখে দিয়েছে, ইমেইল টাইপ করেও মুছে দিয়েছে।
অনেক দূরে থাকে সে, অনেক দূরের মানুষ। অন্য শহর, অন্য জীবন কি দরকার এসবের?
কখনো নিজেকে শাসন করেছে, কখনো নিজের মনকে ঠাট্টা করেছে, কখনো নিজেকেই ভয় পেয়েছে।
বারবার স্ত্রীর কথা মনে পড়েছে, আর অবধারিতভাবে পুপুর। নিজেই নিজেকে বুঝিয়েছে, এটা ওদেরকে ঠকানো নয়। সেতো পুরোপুরি তার সংসারের। ঋতবান জানে এর মধ্যে কোনো পাপ নেই, নিজের মন সম্পর্কে কোনো সন্দেহ নেই তার.. তবু অকারণ কেন যেন একটা অপরাধবোধ কুটকুট করে নেপথ্যে।
কিসের যেন একটা বাধা..
আছে। থেকে যায়।


'পাপ নেই, পাপ নয়', তার মন বলে।
শুধু সে কেমন আছে, সেটুকু জানার ইচ্ছা.. শুধু একবার তার গলাটুকু শোনার ইচ্ছা..
ও নিজেও জানেনা, কি কথা বলবে, কি জিজ্ঞেস করবে!!
একসময় ওরা দুজনে দুজনের সবকিছু ছিল, সম্পর্ক মুছে গেলে কি অনুভূতিও পুরোটাই মরে যায়?
এ শুধু সেইটুকু শুভাকাঙ্খা, এর মধ্যে ক্ষতিকর, বিপজ্জনক কিছু নেই।
এ শুধুই, মনের খুব.. খুব গভীর থেকে তুলে আনা ভীষণ গোপন একটা অপ্রয়োজনীয় অথচ তীব্র আকাঙ্খা।


অনেকক্ষণ ধরে রিং হচ্ছে। অপেক্ষার শব্দ ..
শেষ রিংটায় ফোনটা রিসিভ করলো কেউ.. 'হ্যালো?'
শ্রীতমা।
শ্রীতমাই..
দশটা বছর কেটে গেছে, তবু গলা চিনতে একটুও ভুল হয়না ওর।
ভীষণ ..ভীষণ চেনা আওয়াজ.. চেনা ঝংকার.. চেনা শব্দ.. চেনা সুর..
একটু বসা আওয়াজটা.. হয়তো সর্দি হয়েছে, ওর খুব ঠান্ডার ধাৎ ছিল।
কিন্তু একশো বছর পরেও ওই গলা চিনতে একটুও ভুল হবার কথা নয়..


'হ্যালো' বলে ঋতবান। উত্তেজনায় থমথম করছে সারা মাথা..
কিভাবে রিয়াক্ট করবে শ্রী?
..বুক ঢিপ ঢিপ..!!

উত্তর আসে..
'হ্যালো? কে বলছেন?'
'ম্যাডাম, আমি ইনসিওরেন্স কোম্পানি থেকে বলছিলাম, আপনি লাইফ ইন্স্যুরেন্স করাবেন?'
'না.. আমি ইন্টারেস্টেড নই..' শান্ত ভাবে উত্তর দেয় শ্রী, একটু বোধহয় উপেক্ষার স্বর।
'কিন্তু ম্যাডাম, একটা কিছু করিয়ে রাখা ভালো, আমাদের খুব ভালো কিছু অফার আছে'
'আমার করা আছে অলরেডি, নতুন কিছু লাগবেনা। সরি !'
'ঠিক আছে থ্যাংক ইউ, ভালো থাকবেন'
'আপনিও ভালো থাকবেন, ধন্যবাদ..!!'
রিসিভারটা রেখে হাঁফ ছাড়ে ঋতবান। নিজের স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয়ে নিজেই মুগ্ধ.. অনেকবার ভেবেছিলো কি কথা বলবে.. শ্রীতমা চিনতে না পারায় একরকম স্বস্তিই পেয়েছে। অনেক সোজা হয়ে গেছে পুরো ব্যাপারটা।
ভাগ্যিস চিনতে পারেনি। ভাগ্যিস..!!
হালকা পাপবোধটুকু নিমেষে কেটে যায়..


............................



মোবাইল থেকে ফোন করেনি ঋত। বোধহয় অফিসের ফোন.. গলাটা একটু দূরের শোনাচ্ছিল।
শ্বাসের শব্দ শুনে হালকা উত্তেজিত মনে হল..
হ্যালো বলার সময় ওর গলাটা কি আলতো কেঁপে গেছিলো? নাকি মনের ভুল?
ভালো আছে তো?
আশা করি ভালোই আছে, ভালো থাকারই কথা।


অফিসের পর তীর্থ আর তিতিরের সাথে রেস্টুরেন্টে ডিনারের প্ল্যান আছে.. তাড়াতাড়ি বেরোতে হবে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাজে ফিরে যায় শ্রীতমা।

Comments

Popular posts from this blog

সমান্তরাল

কনকাম্বরম

জন্মসূত্রে পাওয়া