শিবঠাকুরের আপন শহর

এও এক শহর। কয়েক হাজার বছর ঘুরে গেছে,শহর রয়ে গেছে। পুরোনো শহরের নতুন হাত পা জুড়েছে, তবু পুরোনো শহর এখনো একই রকম ..


গলির শরীর জুড়ে বাড়ির পর বাড়ি.. ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে থাকে। মানুষ দেখে, ষাঁড় দেখে, বাঁদর, পায়রা, গরু, কুকুর সব দেখে। কখনো জটলা জমলে, ঝগড়া বাঁধলে, মারামারি-হাতাহাতি লাগলে হয়তো গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে..উত্তেজনা কেটে গেলে আবার হাই তুলে তুড়ি মারে। দুপুরের অলস রোদে ভাতঘুম দেয় বাড়িগুলো, নিচে গলির শিরায় প্রাণ বয়ে যায়।


মানুষ, কুকুর, গরু, ষাঁড়..
সাইকেল, ভ্যান রিকশা, বাইক, স্কুটার..
ট্যুরিস্ট, হিপি, সাত্বিক, ঝাঁকাওয়ালা, সাধু, দালাল, পুণ্যার্থী, ভক্ত, পকেটমার, অফিসবাবু, দোকানদার, চোর, পাগল, বদমাশ, ঝাড়ুদার, পুলিশ  ..
আর্টিস্ট কালার রঙের বাক্সের সব কটা রং..
ফুলের, ধূপের, দুধ-মালাইয়ের, পান মশলার, মিষ্টির, ধোঁয়ার, কর্পূরের, নতুন কাপড়ের, গোবরের গন্ধ..
এই সব কিছু একসাথে মিলিয়ে মিশিয়ে জ্যাকসন পোলোকের ছবির মতো ভাবতে পারলে হয়তো গলি গুলোকে আঁকা যাবে।
গলির চেহারা


গলিদের আড্ডাখানা

আশেপাশে, সামনে পেছনে, ডাইনে বাঁয়ে.. যেদিকেই যাও, গলায় গলায় গলাগলি করে গলিদের বিরাট একান্নবর্তী পরিবার। বাবা, মা, ঠাকুমা, জেঠিমা, কাকু, দাদু, ন'দি, ছোড়দি, পিসি, মাসি, বুঁচকি, পটলা, ছোটন, টেঁপি.. মিলেমিশে থাকে ওরা..দারুণ অ্যাডজাস্টমেন্ট। সবাই সবার হাঁড়ির খবর রাখে। গলিদের এক পা ঘাটে, একপা বাড়িতে। মনখারাপ হলে ঘাটের ধারে চুপটি করে গুম হয়ে বসে থাকে। গঙ্গার হাওয়া খেয়ে মন ভালো হয়ে গেলে, আবার গলা জড়াজড়ি করে গল্প সারে।





বাড়িগুলোর গায়ে মাথায় বাঁদর ঘুরে বেড়ায়। পায়রা ওড়ে দুপুর বিকেল। ছাদের কোণে একটা ছেলে হাত নাড়িয়ে ইশারা করে, দানা ছড়ায়, পাখিদের ভাষায় কিসব আবোলতাবোল বলে| ..আর সাদা, মিশমিশে ছাইরঙা, গলার ডোরা, ঝুঁটি মাথা, সবাই ডানা মেলে দেয়। গোল গোল ঘুরে, সোনালী মন্দিরের চুড়ো, গঙ্গা পাড়ে গোলাপি ধোঁয়া, পড়ন্ত আলো, টেলিফোন টাওয়ারের লম্বা গলা, সব পেরিয়ে আবার ছাদে এসে বসে.. দানা খায়। এক চিলতে ছাদ, তার মাথায় আরো ছোট এক ফালি চিলেকোঠার ছাদ। তারই গায়ে পায়রাদের কাঠের বাক্সবাড়ি। পাশের ছাদে আরেকটুকরো চিলেকোঠা, সেই ছাদে হয়তো আরেকটা ছেলের আরেকটা পায়রা স্কুল। কিভাবে যে ওরা নিজেদের ছাত্রছাত্রীদের চেনে, তা বাবা বিশ্বনাথই জানে।

আও..আও..আও
পরিক্রমা
পায়রা নিম্নবিদ্যালয়


গলিদের পাড়ায় জায়গা নেই, তা'বলে কি শহরের বাচ্চারা খেলবেনা? শহরে দোতলা মাঠ আছে..
নিচের তলায় গঙ্গার ঘাট।
সকাল হলেই ঘুম ভেঙে উঠে কচিকাঁচার দল সেখানে খেলতে বেরোয়। বুড়োধাড়িরাও চলে আসে। সব রকম খেলা জমে.. ওরা ক্রিকেট খেলে, ঘুড়ি ওড়ায়, সাইকেল টায়ারকে কাঠি পিটিয়ে দৌড় করায়।
বেলা বাড়লে ঘাটে ঘাটে কাজ বাড়ে, ভিড় বাড়ে, গোলমাল বাড়ে। তারই মাঝে ঘুড়িগুলো সারাদিন আকাশের গায়ে টাঙানো থাকে। মুন্না স্কুল গেলে বড়ে ভাইয়া ওড়ায়, আবার দাদা খেতে যাবার সময় হয়তো পাশের দোকানের চরণের হাতে লাটাই ধরিয়ে যায়। সাদা নীল, লাল, কালো, হলুদ, সবুজ, এখন আবার চকচকে সোনালী.. কত নকশা..
পেটকাটি, চাঁদিয়াল, মোমবাতি, বগ্গা..(এইরে!! গেয়ে ফেলেছিলাম আরেকটু হলেই..!!)....
চওড়া ঘাটের চাতাল জুড়ে ক্রিকেটের আসর বসে। সামলে সুমলে খেলতে হয়, নদীতে না পড়ে যায়।
সন্ধ্যেবেলা ঘাটের সব গোলমাল মিটে যাবার পর আবার খেলা শুরু হয়..এবার গ্যাসের আলোয় ব্যাডমিন্টন।
ঘাটে সবার অবাধ প্রবেশ
ক্রিকেট
রোববারের ম্যাচ

দোতলাতেও খেলা হয়, সে কথায় পরে আসছি।


আগে ঘাটের কথা সারি।

ঘাট এক অদ্ভুত জায়গা, পাশাপাশি হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে ওরা গোটা শহরটা পাহারা দিচ্ছে। গঙ্গায় যেতে হলে ওদের কাছে পরিচয় দিয়ে যেতে হয়..বর্ষার গঙ্গা জল খেয়ে খেয়ে ফুলে গেলেও ওরাই আটকে দেয়, গলিদের পাড়ায় গিয়ে মাতলামি করতে দেয়না

ঘাটের সিঁড়ি

সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি ঘাটের সারি ব্যস্ত থাকে। ভোরের কমলা আলো পেরিয়ে ঝকঝকে সকাল হয়, আর ঘাট জজমাট হতে থাকে। এখানে জীবিকা আর পুণ্য দুইই অর্জন হয়..

পুজো হয়, চান হয়, শ্রাদ্ধ, শান্তি-স্বস্ত্যয়ণ, দাহ, বিসর্জন..পুণ্যার্থীদের হরেকরকম্বা। যার যেমন খুশি, যেমন পকেট বরাদ্দ, সেইমতো পুণ্য সঞ্চয় করতে আসে ওরা। প্রসাদ খায়, চা খায়, পতিতোদ্ধারিনী ওদের কলুষ পরিষ্কার করে, পাপ ধুয়ে দেয়। ঘাটের ধরে ভিখিরি বসে, নাপিত বসে, পুরুত বসে, দশকর্মার দোকান বসে। ভন্ড আর সাধুরা বসে, ব্যোমভোলা ধোঁয়াধারী রাও বসে। গয়না, বাসন এর দোকান বসে, চা জলখাবার বসে।  নৌকা আর বজরাওয়ালারা খদ্দের ধরে, দালালরা ঘুরঘুর করে। তেলের বোতল নিয়ে বসে মালিশওয়ালারা। সূর্য আর গঙ্গাকে সাক্ষী রেখে ধ্যানে বসে, মনঃসংযোগ অভ্যাস করে শিক্ষার্থী পুরোহিতরা। ভবঘুরে, ক্যামেরা হাতে শিকারী, নৌকো বিহারী, বিদেশী ট্যুরিস্টের পেছন পেছন নাছোড় দালাল.. সে এক প্যান্ডেমোনিয়াম।


পুণ্য বিক্রেতা
বিকেলের মজলিস
স্বস্ত্যয়ণ
নাপিত ইত্যাদি..
পড়ুয়া পুরুত

মাছধরা

সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত্রি নামে ঘাটের বুকে। বিশাল হয়ে যাওয়া আশ্চর্য একটা মন নিয়ে গঙ্গা আরতি শেষ হয়। জমজমাট ঘাট দুম করে  খালি হয়ে যায়। হলদেটে আলোয় রাত নামে জলের ধারে। ছোট্ট ছোট্ট ঢেউয়ে মাঝনদী অবধি ছড়িয়ে যায় আলোর টুকরো গুলো। কুচি কুচি প্রদীপ শালপাতার নৌকোয় করে ভেসে যায় স্রোতের টানে। ঘাটের ধাপে পড়ে থাকে ঝাড়ুদারদের ঝাঁটা, ইউনিভার্সিটির ছেলেরা আর ব্যোমভোলাদের দল। সাথে পাহারা দেবার জন্য কয়েকটা কুকুর।

গঙ্গা আরতি

রাতের ঘাট


এই শহর দুপুরের খাওয়াদাওয়া সেরে সারা পরিবার সমেত ছাদে এসে বসে। জানালা খুললে চোদ্দআনা কিছুই দেখা যাবেনা। রোগে অপুষ্ট গলির ওপাশের জানলায় ভাবীজির সাথে গলা বাড়িয়ে নিষিদ্ধ প্রেম বা বড়োজোর হাত বাড়িয়ে লঙ্কা-টমেটো আদানপ্রদানটুকু ছাড়া জানলায় আর কোনো কাজের কাজ নেই গলির পাড়ায়। তাই আরাম আর আলোয় আলোয় মুক্তি খুঁজতে বাড়িগুলো মাথার ওপর আসন পেতে রেখেছে। শীতের দুপুরে রোদটুকু যেমন মিষ্টি, গরম লাগলে আবার পাশের বাড়ির আলসের ছায়ায় সেঁধিয়ে যাবার অপশনও আছে।
বাড়ির পর বাড়ি
দুপুরের ছাদ

ছাদে বসে মায়েরা তরকারি বেছে রাখে, বাবারা ছোটদের ব্যাট ধরতে শেখায়, কুঁচেরা তিনচাকার সাইকেল চালায়, এগারোরা দুলে দুলে পড়া মুখস্থ করে, পনেররা টেস্ট পেপার সল্ভ করে, বয়স্করা ঝিমিয়ে নেয়। সারা পরিবার ছাদের লিভিংরুমে আড্ডা মারে।



হ্যাঁ আর খেলা হয়!! এই সেই দোতলার খেলার মাঠ..!!
গলির পাড়ার ক্রিকেট টুর্নামেন্ট হয় এসব ছাদে..পাশের ছাদ থেকে পুরো পরিবার আম্পায়ারিং করে, চাচা চাচীরা পয়েন্টের হিসেবে রাখে।  সমবেত উল্লাস, সমবেত উত্তেজনা, গোটা পাড়ার টোয়েন্টি-টোয়েন্টি ম্যাচ। এ শহরের বাড়িগুলোর বয়েস হয়েছে। বড়ো অভিজ্ঞ এনারা, বড্ডো স্নেহপ্রবণ। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে কিভাবে যে এরা মানুষদের আগলাচ্ছে, না দেখলে বিশ্বাস নেই।

গলিদের শরীরের ভাঁজে ভাঁজে আছে মন্দির.. গলির মতোই ছোট, বড়, মেজো, সেজো তারা, আকারে, বাহারে আর নামডাকে। আর আছে নানান রঙের দোকান। বোঁচা গলির ঠিক বগলের নিচে আছে এক মালাই রাবড়িওয়ালা। আবার কর্তাবাবু গলির পেটের কাছে অমুক জাপানি ক্যাফে। ছোটোপিসি গলির কানের খাঁজে এক বিখ্যাত পানওয়ালা, আর মেসোমশাই গলির ভুরুর ডানদিকে প্রসিদ্ধ লস্যির দোকান। ন'মামীর মাথা থেকে হাঁটু অবধি বেনারসীর দোকান আর মেজো কাকীর আবার সারা দেহেই পান মশলার দোকান। এই গল্প লিখতে শুরু করলে এখানেই পাতার পর পাতা ভরে যাবে, তাই থামলাম।

থামতে হচ্ছেই। হেলানো আধডোবা মন্দির, গঙ্গা-আরতির হেল্পাররা, ল্যাজ ধরে গরু সরিয়ে গলি পার করে দিয়েছিলেন যে ভাইসাব (থ্যাংক উয়ের উত্তরে ওয়েলকাম বলার সময় অনেক সাবধানতা সত্ত্বেও ছলকে পড়েগিয়েছিলো যাঁর পানের পিক), হ্যাংলা সীগালের দল, ভরদুপ্পুর নিঝুম ঘাটে চুমুখাওয়া ছেলেমেয়ে দুটো, মানমন্দিরের পাশের বাড়ির বারান্দায় পোষা বকবকে টিয়া, যেচে উপকার করা একরাশ মানুষজন, খিচুড়িবাবার মন্দিরের লঙ্গর....এশহরের কত গল্প জমিয়ে বসে করা হলো না, কত্ত কিছুর  খবর দেওয়া হলোনা, কত দৃশ্য আঁকতে পারলাম না।
এ নাকি শিবঠাকুরের শহর। আমার তো মনে হয়, এ হলো সব্বার শহর। যে যেমন করে চাইবে, তার কাছে ঠিক তেমনটি হয়ে যাওয়া শহর..
এ শহরের একরকম নেশা আছে। পুরোনোর নিশ্চিন্ততা.. আলসেমির উষ্ণতা.. হাজার বছর ধরে বয়ে যাওয়া জীবনের রঙ.. আর গঙ্গার সোঁদা হাওয়া..
কোনো এক কমলা আলোর ভোরে, যদি ঘাটের সিঁড়িতে বসে শহরটার সাথে ভাব জমাবার চেষ্টা করেন, আপনিও হয়তো আহির  ভৈরবের সুরে সেতার শুনতে পাবেন।

যেমন আমি পেয়েছিলাম।

Comments

  1. बनारस ना जाके भी घूम लिया... बहुत बढिय़ा लिखी हो छोरी ☺️☺️☺️😊😊😊👍👍👍!!!

    ReplyDelete
  2. Am speechless....exce Excellent description helps me to get the flame of the city.

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

সমান্তরাল

কনকাম্বরম

জন্মসূত্রে পাওয়া