রায়গড়
ছোটবেলা থেকেই শরদিন্দু বন্দোপাধ্যায়ের সদাশিবের গল্প পড়ে পড়ে শিবাজী সম্পর্কে আমার দারুণ আগ্রহ ছিল.. বীর শিবাজী, বুদ্ধিমান শিবাজী, ছত্রপতি শিবাজী।
ঘটনাচক্রে চাকরি সূত্রে গিয়ে পড়লাম পুণে। খাসা জায়গা, চমৎকার জীবন। সত্যি বলতে জীবনের সেরা সময়গুলোর মধ্যে একটা কাটিয়েছি পুণের ফ্ল্যাটে। বন্ধুবান্ধব, অবাধ স্বাধীনতা, কম হোক-বেশি হোক-নিজের উপার্জন। পায়ের তলায় মাটি আর মাথার ওপরে খোলা আকাশ।
পুণের আশেপাশে, মহারাষ্ট্রের অগুন্তি দ্রষ্টব্য স্থানগুলোর মধ্যে বেশিরভাগ দেখা হয়ে গেছিলো আমাদের। একটা বেড়িয়ে আসা শেষ না হতেই, পরেরটা প্ল্যান করে ফেলতাম আমরা।
টুক করে একবার রায়গড় যাওয়া হলো.. প্ল্যান সেরকম কিছু করা হয়নি, হঠাৎই ঠিক হয়েছিল। স’ এর মা, কাকিমা, আমরা চারমূর্তি আর উদু।
সহ্যাদ্রির বর্ষা, যাকে বলে মনোরম। চারদিকের রুক্ষ, শুকনো, বাদামি জমির ওপর ঝলমলে সবুজের ভেলভেট আস্তরণ। সেই সবুজের আবার নানা শেড.. 'মেরাওয়ালা গ্রীন'। একটু ওপরে উঠলেই মেঘের মধ্যে ঢুকে পড়া.. আর পাহাড়ের প্রত্যেকটা খাঁজে একটা করে মরশুমি ঝর্ণা।
তো সেইসব মনোরম রাস্তা দেখতে দেখতে হুল্লোড় করতে করতে গিয়ে পৌঁছলাম একটা পাহাড়ের মাথায়। গাড়ির রাস্তা এই অবধিই।
এরপর রোপওয়ে।
রোপওয়ে নিয়ে এমন কিছু আহামরি আগ্রহ ছিলোনা। কিন্তু কুড়ি মিনিট অপেক্ষার পর যখন গিয়ে বসলাম ঝুলন্ত বাক্সটায়, তখন বেশ পুলক পুলক ভাব হচ্ছিলো।
যারা কোনো না কোনো এক জায়গায় রোপওয়ে চড়েছেন, তাদের জন্য নতুন কিছু না.. তবু একটা অদ্ভুত সমীহ জাগছিল সামনের দৃশ্যটা দেখে। ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের মধ্যে দিয়ে দেখছিলাম, আমাদের বাক্সটা মাঝারি গতিতে সামনে একটা উঁচু গাঢ় সবুজ পাঁচিলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে,যার ওপরটা মেঘে আবছা হয়ে আছে.. আর সেই পাঁচিল এর বিভিন্ন জায়গা থেকে তিন চারটে সরু মোটা ঝর্ণা সজোরে ঝরে পড়ছে। সামনের পাহাড়টা বেশ উঁচু। বর্ষায় সবুজ আর খাঁজে খাঁজে ঝর্ণা জুড়ে গিয়ে ব্যাপারটা সমীহ করার মতোই।
মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিলো এই বোধহয় গিয়ে ওই পাঁচিলের গায়েই আছড়ে পড়বে গাড়িটা। বেশ কাছে এসেই হঠাৎ গাড়ির গতিপথ ওপরের দিকে উঠতে শুরু করলো। আর কয়েক মিনিটের মধ্যে পাহাড়ের ওপর আসল দুর্গের পাঁচিলে পৌঁছে গেলাম আমরা।
চারিদিক মেঘে ঢাকা, ঘন মেঘের মধ্যে দশ বারো হাতের বেশি দেখা যাচ্ছেনা। ভিজে স্যাঁতস্যেতে দুর্গের দেয়াল আর ভেতরের পথ ঘাট..আমরাও ভিজে ভিজে যাচ্ছি।
ভেজা দেয়ালের গায়ে মরশুমি সবুজ পাতারা জেগে উঠেছে। মহারাষ্ট্রের বাকি সব দুর্গের মতো, এখানেও শুধু দেয়ালগুলোই বেঁচে আছে.. ঘরের পর ঘর পেরিয়ে এগোতে এগোতে দুর্গের অন্য প্রান্তে চলে এলাম আমরা। খোলা জায়গা পেরিয়ে, শিবাজীর মূর্তি পেরিয়ে, বাঘার মূর্তি, শিবাজীর সমাধি, সব পেরিয়ে গোল গোল বুরুজে এসে বসলাম আমরা পাঁচজন। এখান থেকে সজাগ প্রহরীরা চোখ রাখতো, শত্রু আসছে কিনা। সামনে ঢালু পাহাড় নিচে নেমে গেছে, বেশিদূর দেখাও যাচ্ছেনা মেঘের মধ্যে।
খানিক পরে উঠে আসছি, এমন সময়ে হঠাৎই সব মেঘ হুড়মুড় করে সরে গেলো।
যেন তাড়া আছে, দেরি হয়ে গেছে।
যেন আমাদের দেখাবে বলেই চারদিক আলোয় আলো হয়ে গেলো।
দূরের পাহাড়, কাছের দেয়াল, ভেজা কালো পাথুরে পাঁচিলে ঘাসের দোল খাওয়া পাতারা, ওই নিচে নেমে যাওয়া পায়ে হাঁটা রাস্তার ধারে রাজার বানানো কাকচোখ ঝিল.. সব হঠাৎই কোটি পিক্সেলের স্বচ্ছতায় ঝলমল করে উঠলো।
চেষ্টা করে ওই ছবি শব্দে আঁকা সম্ভব নয়.. অন্তত অবন ঠাকুর ছাড়া আর কারুর পক্ষে।
যতদূর চোখ যায়, পাহাড়ের পর পাহাড় জুড়ে অন্তত তিন রকম, গাঢ় সবুজ, আরো গাঢ় সবুজ আর ঝকঝকে সবুজের ছোপ ছোপ, স্তূপ পর্বতের ধাপে ধাপে জেগে আছে। মাঝে মাঝে ঝকঝকে পান্না সবুজের এক একটা ছোপ এত উজ্জ্বল, যে চোখ ঝলসে যাবার জোগাড়।
পাহাড়ের গা, নিচের উপত্যকা সব যেন ভেলভেটে ঢাকা, এত মোলায়েম। মাঝে মাঝে এক একটা সাদা পাতলা স্রোতে ঝর্ণা নেমে এসেছে তাদের গা থেকে।
ঝিল গুলো কালো হীরের মতো দেখতে লাগছে। বৃষ্টি ধুয়ে সব এত উজ্জ্বল, এতো ঝলমল যে চোখ ফেরানো যায়না। আবার মাঝে মাঝে না ফেরালে "চোখে ঝিলমিল লেগে যাবে"।
ফেরার সময় হয়ে গেছিলো। আবার সেই রোপওয়ে যাত্রা।
নিচের দিকে নামার সময় দুম করে পেটের মধ্যে খালি খালি হয়ে যায়। সবচেয়ে বড়ো কথা, নিচে কোথায় যাচ্ছি, দেখতে পাচ্ছিনা। নিচে মেঘের আস্তরণের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে, কোন অজানা দুর্গতির মধ্যে নিয়ে গিয়ে ফেলে দিচ্ছে। তারপর দুমিনিট পরে যেই মেঘ পেরোলাম, নিচে কার্পেটের মতো সবুজ উপত্যকা জেগে উঠলো আবার। ক্ষেত, জল, রাস্তা, বাড়ি, সবুজ-নীল-বাদামি আর আরো অনেক অনেক সবুজ।
বর্ষার সহ্যাদ্রি অসম্ভব সুন্দর।
তবে এক দুটো জায়গা ঘুরলেই বোঝা যায় বাকি জায়গা গুলো কেমন লাগবে। অথচ তারই মধ্যে এক একটা জায়গা একটু একটু অন্যরকম।
অনেক শখ করে ক্যামেরা কিনেছিলাম, নানা জায়গা ঘুরবো, আর সুন্দর সুন্দর জায়গার ছবি তুলবো ভেবে। মুশকিল হলো, যতটা ভালো লাগে, তার দশ ভাগও ক্যামেরায় ধরা পড়েনা।
অনেক খুঁজে খুঁজেও রায়গড়ের ছবি গুলো পাচ্ছিলামনা।
তারপর দুটো আলাদা দেশে, আলাদা মহাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাকি চারজনের কাছে এস-ও-এস পাঠিয়ে কিছু ছবি পাওয়া গেলো, আর নিজের হারিয়ে যাওয়া পুরোনো হার্ড ডিস্কটাও অবশেষে ঝেড়েপুঁছে বের করা গেলো।
তবে না পেলেও ক্ষতি ছিলোনা .. মনের মধ্যে ছবি গুলো ওই পান্না সবুজের মতোই ঝলমল করছে। করবে আজীবন।
Jaboooooo😭😭😭😭😭
ReplyDeleteযা যা ঘুরে আয়, সুযোগ আছে যখন মিস করিসনা।
DeleteKi sundor chobi gulo
ReplyDeleteথ্যাংকু মণি
Delete