লেবুর গন্ধে ভর্তি জীবন..
“সত্যনারায়ণ মিষ্টান্ন ভান্ডারের পাশ দিয়ে সোজা ঢুকে যাবি। লাল বাড়ি-সাদা বর্ডার এর পর মাখন রঙের বাড়িতে লাল বর্ডার, তারপরে আরেকটা ঘিয়ে রঙের বাড়িতে, সবুজ দরজা জানালা।
সেটা পেরিয়ে ডানগলিতে ঢুকবি, ঢুকেই দেখবি পোকামামার মুদি দোকান। দোকানের সামনে তিনটে বেড়াল বসে আছে দেখবি। ওই দোকানে পুলু তাতাইয়ের বাড়ি জিগেস করলেই দেখিয়ে দেবে।”
বাস স্টপে নেমে ওদের বাড়ি কিভাবে যাবো, জানাতে গিয়ে শ্রমণা ডেস্কের ওপর চক দিয়ে রাস্তা আর দোকান বাড়ি আঁকছিলো, পোকামামা আর বেড়ালও। ওর স্বভাব ছিল এঁকে এঁকে সব কথা বলা.. পথনির্দেশ তো তাও ঠিক আছে, যথেষ্ট দরকারি। কিন্তু সিনেমার গল্প, খেলার নিয়ম, সবই ও ছবি এঁকে বোঝাতো।
জীবনের প্রথমবার বন্ধুদের সাথে, বাবা-মা বাদ দিয়ে পুজোর প্যান্ডেল ভ্রমণের প্ল্যান করছিলাম আমরা।
বাবা পৌঁছে দিয়েছিলো, ওর বাড়ি। বাকিদেরও একই গল্প। তারপর আমরা শুধু কয়েকজন বন্ধু মিলে বড় হবার স্বাদ নিয়ে বেরিয়েছিলাম।
সেটা অন্য গল্প।
কিন্তু ব্যাপারটা হলো, সেই সত্যনারায়ণ মিষ্টান্ন ভান্ডার, সেদিন, এবং তার পরে অনেক অনেক দিন আমাদের পথনির্দেশ জুগিয়েছে। অটোতে করে যেতে যেতে সত্যনারায়ণ দেখলে থামতে বলতাম, বাসে যেতে যেতে ওই দোকানটা দেখলেই দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াতাম।
অবশ্য আমার মনে হয় বাংলার অর্ধেক মানুষের বাড়ির রাস্তাই কোনো না কোনো মিষ্টির দোকানের ডান-বাঁ-পাশ বা উল্টো দিকের রাস্তায় হয়ে থাকে।
চালচিত্র সিনেমাটার মতো মাঝে মাঝে জানতে ইচ্ছে করে.. "আচ্ছা, ঠিক কটা সত্যনারায়ণ মিষ্টান্ন ভান্ডার আছে কলকাতায়?"
বাড়ি থেকে স্কুল যেতে পঁয়তাল্লিশ থেকে পঞ্চাশ মিনিট লাগতো, বাসে। ক্লাস ইলেভেনে ওঠার পর থেকে একা যাওয়ার ভরসা পেয়ে গেলাম, হঠাৎ। আমিও, বাড়ির লোকজনও। এলগিন রোড পেরোতেই দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াতাম, আর স্টপেজের সামনে এলেই কন্ডাক্টর চেঁচিয়ে বলতো "আস্তে…বাচ্চা লেডিস !"
অনেক অনেক দিন, ইন ফ্যাক্ট অনেক বছর ধরে ভাবতাম, আমার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো মহিলা এবং বাচ্চা লাইন দিয়েছে নামার জন্য। স্কুলে ঢোকার তাড়ায় প্রায় কোনোদিনই পেছন ফিরে দেখিনি। কখনো দেখে থাকলেও ওরকম কাউকে না দেখে খুব বেশি ভাবিনি।
অবশেষে একদিন শ্রাবস্তীর কাছে শুনলাম কলেজে পড়ার পরেও তাকে যে কন্ডাক্টর বাচ্চা বলে, তাতে তার প্রবল আপত্তি।
ওটা যে বাচ্চা এবং লেডিস নয়, বরং আমাকে সম্মান জানিয়েই পুরোটা একসাথে বলা হচ্ছে, এই মহান বুদ্ধিটা আগে উদয় হয়নি।
প্রায় রোজই বাস স্টপ থেকে স্কুল অবধি রাস্তাটুকু দৌড়ে দৌড়ে যেতাম,মানে সত্যি সত্যি দৌড়ে না, কিন্তু প্রায় দৌড়োবার মতো করে হেঁটে, যাতে প্রেয়ার লাইন মিস না হয়ে যায়। লেট লাইনে দাঁড়ালে এমনিতেই দিদিমণিদের একটু ভুরু কোঁচকানো বা নিদেনপক্ষে ধারালো দৃষ্টি পড়তো। তার থেকেও দেরি করলে, প্রেয়ার এর পর লেট লাইনটাও মিস হয়ে গেলে ব্যাপারটা ঘাড় নাড়া বা ঠোঁটের কোণ থেকে বেরোনো 'মিছ' অবধিও চলে যেতে পারতো। আর সেই সময়, সেই বয়েসে দিদিমণিদের ভ্যালিডেশনের যে কি দাম, সেটাতো নতুন করে বলার কিছু নেই..
আমার কপাল, যখন যখন যেখানে যেখানে আমি রোজকার যাতায়াত করতাম, সেখানে সেখানে তখন তখনই একটা করে ব্রিজ বা ফ্লাইওভার বানাবার দরকার পড়েছে শহরের।
মোড়ের মাথায় বাসস্টপ থেকে স্কুল অবধি রাস্তার অর্ধেক জুড়ে ফ্লাইওভারের জন্য খোঁড়াখুঁড়ি, ফুটপাথ একজনের চলার মতো সরু হয়ে গেছে। তার মধ্যে লোকজনকে পাশ কাটিয়ে দৌড়োচ্ছি। একদিকে পড়লে কাদাজলে ভরা চারফুট গর্ত, আরেকদিকে পড়লে সিঙ্গাড়াওয়ালার তেল ভর্তি কড়া। সুপার মারিও কোথা থেকে ইন্সপায়ার্ড বুঝছেন তো?
একদিন, তখন ক্লাস ইলেভেন, আরজু খুব সিরিয়াস মুখ করে এসে বললো, চল তোকে সত্যিকারের পরী দেখাবো। প্রথমটা ইয়ার্কি ভাবলাম, তারপর অবিশ্বাস পেরিয়ে কৌতূহল হলো.. কারণ প্রথমত উল্টোপাল্টা পাগলামির মানুষ ও নয়, তাছাড়া ওর কথা বার্তায় সত্যি ছাড়া মিথ্যের কোনো আভাস ছিলনা। দেখিই না কি ব্যাপার, ভেবে বারান্দায় যাবার পর ওর কথা মতো একটা বিশেষ স্পট থেকে গলা বাড়িয়ে উঁকি মারতে দেখি, ভিক্টোরিয়ার পরী দেখা যাচ্ছে। সত্যিকারের পরী।
বলাই বাহুল্য আমাদের মধ্যবিত্ত স্কুল ছিল মহা ঝাঁ চকচকে একটা পাড়ায়। সে পাড়ার গলিতে আমাদের মতো লম্বা ঝুল স্কার্ট আর তেলতেলে বিনুনিতে নাইলনের চকচকে ফিতে বেমানান। কিন্তু আমরা সগর্বে সে পাড়ায় ঘুরে বেড়াতাম। হইচই করে, রাস্তাশুদ্ধ লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, মহুলের কাছে পাঁচ টাকার ভুট্টা দশটাকায় কিনে খাওয়ানোর জন্য ঝুলোঝুলিও করতাম। মাঝে মাঝে ভাবি, ওই কনফিডেন্সের কণামাত্র যদি এখনো থাকতো..
কয়েক বছর আগে একটা নতুন পাড়ায় থাকা শুরু করেছি.. যদিও নামে কলকাতা, তবু এলাকাটা একেবারেই পাড়াগেঁয়ে। পাঁচশো মিটার গেলে সত্যিকারের গ্রাম, পঞ্চায়েত, ক্ষেত, কাদামাখা মেটে রাস্তা, সঅ'ব পাওয়া যায়।
নতুন বাড়ির পথনির্দেশও বাজারের একটা মিষ্টির দোকানের উল্টোদিকের গলি - কালীমাতা মিষ্টান্ন ভান্ডার, প্রসিদ্ধ মিষ্টান্ন বিক্রেতা।
জায়গাটা খুব তাড়াতাড়ি শহরতলি হয়ে উঠছে, ছোট বড় ফ্ল্যাটে ছেয়ে যাচ্ছে সব রাস্তা.. বাজারের মুখটায় রিকশা, অটো, বাস, লরি, সাইকেল, লোকজন, সব মিলিয়ে জটিল রকম ঘিঞ্জি। তাই ইচ্ছে করেই ওই দিকটা এড়ানোর জন্য উল্টোদিকের একটা রাস্তা ব্যবহার করতাম। তারপর একদিন কি যেন একটা জরুরি জিনিস কিনতে, প্রায় মাস তিনেক পর বাজারে এসে দেখি.. ওমা.. ! মিষ্টির দোকানের হোর্ডিং হলুদ থেকে কটকটে লাল হয়ে গেছে, নামের শুরুটাও বদলে গেছে। নতুন নামটা কি বলুনতো? গেস করতে পারলে প্রাইজ নেই.... নিউ সত্যনারায়ণ মিষ্টান্ন ভান্ডার।
পারতপক্ষে কোনো মিষ্টির দোকানের ধার মাড়াইনা, কিন্তু সেদিন নিউ সত্যনারায়ণ থেকে দই আর বোঁদে কিনতে হয়েছিল, নাম মাহাত্যের মান রাখতে হতো কিনা।
মিষ্টি খেলে নাকি ওজন বাড়ে। আমি বাঙালির কলঙ্ক, মিষ্টি একদম পছন্দ করিনা। কিন্তু আমার শরীর একথা জানেনা, যাই খাই, মিষ্টি ভেবে নেয়। এখন যা অবস্থা দাঁড়িয়েছে, আদর্শ বিএমআই কে অনেকটা পেছনে ফেলে আমি এগিয়ে চলেছি। এই যাত্রা অনেকদিন আগে থেকেই শুরু হয়ে গেছে, থামতে পারছিনা। ওজন কমানোর ইচ্ছের গেরো থেকে বেরিয়ে, ডায়েট আর জিমের রুটিনকে ধরে রাখার চেষ্টায় বার বার ফেল করে, অবশেষে শুধুমাত্র ফিট থাকার সদুদ্দেশ্য টুকুকে আঁকড়ে ধরেছি।
ইতি বুদ্ধি দিলো, 'অতিরিক্ত কিছু দরকার নেই, খালি সকাল বিকেল হাঁটবি। কিন্তু পায়চারি করার মতো হেলে দুলে হাঁটলে হবেনা, জোরে হাঁটতে হবে..সেকেন্ডে দুটো করে পা.. বুঝলি?'
বোঝার চেষ্টা করলাম। কিন্তু প্র্যাকটিস করতে গিয়ে দেখলাম মহা ঝামেলা। গুনতে গিয়ে ঠিক করে হাঁটা যাচ্ছেনা। তারপর একটু অভ্যাস করতে করতে দুদিন কাটিয়ে বুঝতে পারলাম এই স্পিড ধরে রাখতে হলে ঠিক কি করতে হবে। ইতিকে ফোন করে বললাম, এতো কিছু কঠিন করে না বলে এটা বলতে পারলিনা যে বাসস্টপ থেকে প্রেয়ার লাইন লক্ষ্য করে হাঁটতে হবে..যাতে লেট-লাইনটাও মিস না হয়ে যায়..?
Pore valo laglo besh, nijer choto bela mone pore gelo
ReplyDeleteতোরাও দৌড়তিস বুঝি?
Deleteখুশি হলাম ভালো লেগেছে শুনে।
Kemon laglo ekhane bolbo na ekta khata-pen niye asbo setai bhabchhi
ReplyDeleteখাতা চাই কেন? সারসংক্ষেপ লিখবি? দাঁড়া সান্ত্বনাদিকে ডাকছি।
DeleteKemon laglo setao chobi eke bojhabi naki shreya??? Palai baba.
ReplyDeleteএই রে, এটা তো ভেবে দেখিনি। সেই ছবিতে রিভিউ দেখতে চাই..
DeleteAro kichu chai,mon ta bhorlo na...
ReplyDeleteমণি, সব গল্প লিখতে গেলে তো খুব মুশকিল, উপন্যাস হয়ে যাবে। কখনো আত্মজীবনী লিখতে বসলে ভেবে দেখবো।
Delete